
প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জন্য বিশেষ বরাদ্দ বিতরণে বৈষম্য করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলেছে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল। অভিযোগ অনুযায়ী, যেসব সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্যরা বিরোধী দলের, সেসব এলাকায় সমানভাবে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর দুই সংসদ সদস্য আখতার হোসেন এবং আবদুল হান্নান মাসউদ।
আজ সোমবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে তাঁরা এ অভিযোগ উত্থাপন করেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
‘দুর্যোগ শুধু সরকারি আসনে আসে না’—আখতার হোসেন
সম্পূরক প্রশ্নে আখতার হোসেন বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে ৩০ এপ্রিল যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা মূলত সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের আসনগুলোতেই সীমিত ছিল। বিরোধী দলের আসনগুলোতে একই সময়ে বরাদ্দ না যাওয়ায় সাধারণ মানুষ বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি সংসদে বলেন, দুর্যোগ কোনো রাজনৈতিক পরিচয় দেখে আসে না। তাই বরাদ্দও দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে হওয়া উচিত নয়।
আখতার হোসেন আরও বলেন, জনগণের করের টাকায় পরিচালিত এই বরাদ্দ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের বিভাজন থাকলে তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রীর ব্যাখ্যা
অভিযোগের জবাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বৈষম্য করা হচ্ছে না। তিনি জানান, দুর্যোগের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং সেখানে সংসদ সদস্যদের মতামত ও চাহিদা বিবেচনায় নেওয়া হয়।
মন্ত্রী বলেন, টিআর (Test Relief) ও কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) কর্মসূচির ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা চাহিদাপত্র দেন এবং সেই অনুযায়ী বরাদ্দ প্রদান করা হয়।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে সব সংসদীয় আসনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আওতায় নির্ধারিত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রতি আসনে কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা) ২৫ লাখ টাকা, টিআর ৩০ লাখ টাকা, কাবিখা (চাল) ২০ মেট্রিক টন এবং কাবিখা (গম) ২০ মেট্রিক টন বরাদ্দ রয়েছে।
অতিরিক্ত বরাদ্দও প্রয়োজন অনুযায়ী দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
একই প্রশ্নে হান্নান মাসউদের বক্তব্য
একই বিষয়ে প্রশ্ন তুলে এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ বলেন, বরাদ্দ বণ্টনে সমতা নিশ্চিত না হলে দুর্যোগকবলিত জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান এবং সব সংসদীয় এলাকায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি তোলেন।
মন্ত্রী জানান, বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের কোনো ভূমিকা নেই এবং প্রয়োজন ও বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, “কাল-পরশুর মধ্যে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের এলাকাতেও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পৌঁছে যাবে।”
আশ্রয়কেন্দ্র ও দুর্যোগ প্রস্তুতি নিয়ে তথ্য
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নূরুন্নিসা সিদ্দীকার প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বাড়াতে ব্যাপকভাবে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে।
বর্তমানে দেশে রয়েছে—
৫৮৮টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র
৩২৭টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র
১১৫টি দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র
এছাড়া আরও নির্মাণাধীন রয়েছে—
১১৫টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র
৯০টি বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্র
১১২টি দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র
সার্বিক চিত্র
সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বরাদ্দের বণ্টন নিয়ে বিরোধী পক্ষের অভিযোগ ও সরকারের ব্যাখ্যার মধ্যে তর্ক-বিতর্কের পরিবেশ তৈরি হয়। একদিকে বিরোধী সংসদ সদস্যরা সমতা ও স্বচ্ছতার দাবি জানান, অন্যদিকে মন্ত্রণালয় দাবি করে—নিয়ম অনুযায়ী এবং চাহিদার ভিত্তিতেই বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিল বণ্টন নিয়ে সংসদে আবারও রাজনৈতিক বিতর্ক ও প্রশাসনিক ব্যাখ্যার দ্বিমুখী অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।