
নাটোরে গ্যাস–সংযোগ কবে দেওয়া হবে—এ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে বুধবার একপর্যায়ে জমে ওঠে ‘দুলাভাই-শালা’ আলাপ। নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদারের (দুলু) প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ নিজেকে ‘নাটোরের জামাই’ হিসেবে পরিচয় দেন। এর জবাবে রুহুল কুদ্দুস তালুকদারও মন্ত্রীকে সম্বোধন করেন ‘দুলাভাই’ বলে। পরে নোয়াখালীর এক সংসদ সদস্য মন্ত্রীকে নোয়াখালীতে আরেকটি বিয়ে করার পরামর্শ দিলে সংসদকক্ষে হাসির রোল পড়ে যায়।
বুধবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশে নাটোর জেলার শিল্প ও আবাসিক খাতে গ্যাস–সংযোগের বিষয়টি উত্থাপন করেন এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার।
নাটোরে শিল্প আছে, গ্যাস নেই
প্রশ্ন উত্থাপন করে রুহুল কুদ্দুস তালুকদার বলেন, নাটোর একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহর হলেও এখনো গ্যাস–সংযোগের বাইরে রয়েছে। সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত নাটোর সুগার মিল, মিল্ক ভিটা ছাড়াও মেঘনা গ্রুপ, আরএফএল, পারটেক্সসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিন্তু গ্যাস–সংযোগ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং সম্ভাব্য কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, নাটোর হয়ে রাজশাহীতে গ্যাস সরবরাহ করা হলেও নাটোরের মানুষ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখনো সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফলে দীর্ঘদিনের এই দাবি নতুন করে সামনে এসেছে।
‘সিলেটের দামান, নাটোরের জামাই’
জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বক্তব্যের শুরুতেই কিছুটা হালকা মেজাজে বলেন, সংসদীয় পরিভাষায় ‘উইট অ্যান্ড হিউমার’ বলে একটি বিষয় আছে এবং তিনি সেটির আশ্রয় নিতে চান।
মন্ত্রী বলেন, রাজনীতিবিদদের বিভিন্ন জায়গায় শ্বশুরবাড়ি থাকে। সিলেটে গেলে তাঁকে ‘সিলেটের দামান’ বলা হয়, আর নাটোরে গেলে সবাই তাঁকে ‘নাটোরের জামাই’ বলে সম্বোধন করেন। এ মন্তব্যের পর সংসদকক্ষে হাস্যরসের আবহ তৈরি হয়।
গ্যাস প্রকল্প বন্ধের জন্য আগের সরকারের সমালোচনা
হাস্যরসের মধ্যেই মন্ত্রী নাটোরে গ্যাস সরবরাহ প্রকল্পের ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সরকার নাটোরসহ উত্তরাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্যে উত্তরাঞ্চল গ্যাস সঞ্চালন কোম্পানি গঠন করেছিল এবং প্রকল্পের কাজও শুরু হয়েছিল।
তাঁর দাবি, পরবর্তী সরকার ২০১২ সালে প্রায় ৮১ কোটি টাকার সেই প্রকল্প বন্ধ করে দেয়। ফলে উত্তরাঞ্চলে গ্যাস সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি।
মন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, গত ১৭ থেকে ১৮ বছরে গ্যাস অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি এবং একটি নতুন কূপও খনন করা হয়নি। তাঁর মতে, প্রতি বছর চারটি করে কূপ খনন করা হলে দেশের বর্তমান গ্যাস সংকট অনেকটাই কমে আসত।
সমুদ্রের গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন উদ্যোগ
দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা অর্জনের পরও বঙ্গোপসাগরে সম্ভাব্য গ্যাস ও তেল অনুসন্ধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অথচ প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমার সমুদ্রের সম্পদ উত্তোলনে এগিয়ে গেছে।
তিনি জানান, বর্তমান সরকার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধানে আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান রিগের সঙ্গে আরও পাঁচটি রিগ যুক্ত করে দ্রুত নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে।
‘নাটোর আমার শ্বশুরবাড়ি, গ্যাস দিতেই হবে’
গ্যাস অনুসন্ধানের পরিকল্পনা তুলে ধরার পর নাটোর প্রসঙ্গে ফিরে মন্ত্রী বলেন, নাটোর তাঁর শ্বশুরবাড়ি এবং সেখানে গ্যাস দেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “আমরা যখন গ্যাস পাব, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যে কাজ শুরু করে গিয়েছিলেন, ইনশা আল্লাহ আমরা সেই কাজ শেষ করব।”
‘এটা তো শ্বশুরবাড়ির আবদার হয়ে গেল’
সম্পূরক প্রশ্নে রুহুল কুদ্দুস তালুকদার নাটোরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে দ্রুত গ্যাস–সংযোগের সময়সীমা জানতে চান। তিনি বলেন, নাটোর শুধু কবি জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেনের শহর নয়, এটি রানি ভবানীর শহরও। একই সঙ্গে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে নাটোরের রাজনৈতিক সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
জবাবে মন্ত্রী বলেন, “এটা তো শ্বশুরবাড়ির আবদার হয়ে গেল।”
তিনি জানান, নতুন করে কূপ খননের কাজ শুরু হয়েছে। গ্যাসের নতুন মজুত আবিষ্কৃত হলে বন্ধ হয়ে যাওয়া ৮১ কোটি টাকার প্রকল্পটি পুনরায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ভবিষ্যতে নাটোরে গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
‘নোয়াখালীতেও একটা বিয়ে করেন’
আলোচনার একপর্যায়ে নোয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য এম মাহবুব উদ্দিন খোকন মজার ছলে বলেন, যদি নাটোরে শ্বশুরবাড়ি থাকার কারণে গ্যাস–সংযোগ অগ্রাধিকার পায়, তাহলে মন্ত্রী নোয়াখালীতেও আরেকটি বিয়ে করতে পারেন। তাহলে নোয়াখালীবাসীও গ্যাস পাওয়ার দাবি জানাতে পারবে।
খোকনের এই মন্তব্যের সঙ্গে সঙ্গেই সংসদকক্ষে হাসির রোল পড়ে যায়।
স্পিকারের প্রশ্ন, মন্ত্রীর জবাব
পরিস্থিতি আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে যখন স্পিকার মন্ত্রীর উদ্দেশে প্রশ্ন করেন, “মাননীয় মন্ত্রী, আপনি কি বিয়ে করতে চান?”
জবাবে মন্ত্রীও রসিকতার সুর বজায় রেখে বলেন, “আমার সামনে ওনারা বসে আছেন। ওনারা শরিয়াহ আইন ভালো বোঝেন। তিনটা বাকি আছে এখনো, কিন্তু আমার আর শখ নাই।”
মন্ত্রীর এই মন্তব্যে সংসদকক্ষে আবারও হাসির পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
হাস্যরসের আড়ালে জ্বালানি সংকটের বাস্তবতা
সংসদের আলোচনায় হাস্যরস ও পারিবারিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ সামনে এলেও মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেশের গ্যাস সংকট, নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রম এবং উত্তরাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা। নাটোরের শিল্পাঞ্চলে গ্যাস–সংযোগের দাবির মাধ্যমে আবারও সামনে এসেছে জ্বালানি অবকাঠামো সম্প্রসারণ, গ্যাস অনুসন্ধান এবং আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করার প্রশ্ন। সরকারের পক্ষ থেকে নতুন কূপ খনন ও গ্যাস অনুসন্ধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও নাটোরবাসী কবে নাগাদ বাস্তবে গ্যাস–সংযোগ পাবে, সেই প্রশ্নের নির্দিষ্ট সময়সীমা অবশ্য এখনো জানানো হয়নি।