
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় অবস্থিত লালন শাহর মাজার এলাকায় ‘সংস্কৃতির নামে অনৈতিক কর্মকাণ্ড’ এবং মাদকের বিস্তার ঘটছে বলে জাতীয় সংসদে অভিযোগ তুলেছেন কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য আমির হামজা। তিনি জানতে চেয়েছেন, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকাকে মাদকমুক্ত করতে সরকারের কোনো বিশেষ উদ্যোগ রয়েছে কি না।
বুধবার জাতীয় সংসদে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সম্পূরক প্রশ্নে তিনি বিষয়টি উত্থাপন করেন। জবাবে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী জানান, শুধু লালন শাহর মাজার এলাকা নয়, সরকার পুরো দেশকেই মাদকমুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
সংসদে আমির হামজার প্রশ্ন
প্রশ্নোত্তর পর্বে বক্তব্য দিতে গিয়ে আমির হামজা বলেন, কুষ্টিয়ার লালন শাহর মাজার এলাকায় প্রতিবছর জন্মবার্ষিকী ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এসব অনুষ্ঠানে সংস্কৃতির নামে এমন কিছু কর্মকাণ্ড চলে, যা তাঁর মতে অনৈতিক এবং সেখানে মাদকের ব্যবহার ও বিস্তারও রয়েছে।
তিনি মন্ত্রীর কাছে জানতে চান, “কুষ্টিয়ার লালন শাহর মাজার এলাকাকে মাদকদ্রব্যমুক্ত এলাকা করার জন্য কোনো উদ্যোগ আছে কি না? কারণ এখানে প্রশাসনের পাহারায় জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ছয় দিনব্যাপী অনুষ্ঠান হয়। সেখানে সংস্কৃতির নামে যে সমস্ত অনৈতিক কর্মকাণ্ড হয়, সেগুলো বন্ধ করার কোনো উদ্যোগ সরকারের আছে কি না?”
সংসদ সদস্যের এই বক্তব্যের মাধ্যমে লালন একাডেমি ও মাজারকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক আয়োজনের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়।
‘শুধু কুষ্টিয়া নয়, সারা দেশকে মাদকমুক্ত করতে চাই’
জবাবে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, সরকারের লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট এলাকা নয়; বরং পুরো বাংলাদেশকে মাদকমুক্ত করা।
তিনি বলেন, “শুধু কুষ্টিয়ার লালন শাহর স্মৃতিবিজড়িত এই এলাকায় নয়, সারা দেশে মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা পুরো বাংলাদেশকে মাদকমুক্ত করতে চাই। এ জন্য ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।”
মন্ত্রী বলেন, মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে সরকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশ হিসেবেই দেখছে। তাঁর মতে, সমাজে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেলে এবং মানুষের জীবনমান উন্নত হলে মাদকের বিস্তারও কমে আসবে।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মাদক নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক
মাদক নির্মূল প্রসঙ্গে সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সমাজে কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং ইতিবাচক সামাজিক পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি।
তিনি বলেন, “একটি সমাজে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেলে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হলে মাদকমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা সহজ হয়। তাই আমরা মাদকবিরোধী উদ্যোগকে সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করে দেখছি।”
অতীত সরকারের সমালোচনা
জবাবে মন্ত্রী দেশের মাদক পরিস্থিতির জন্য বিগত সরকারের সমালোচনাও করেন। তিনি বলেন, গত প্রায় ১৮ বছরে দেশে মাদকের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে এবং সে সময়ের ক্ষমতাসীনদের একটি অংশও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশে গত ১৮ বছর যে অন্ধকার সময় অতিক্রান্ত হয়েছে, সে সময়ে মাদক ভয়াবহভাবে বিস্তার লাভ করেছে। অনেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতাও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এর ফলে শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
তাঁর ভাষায়, সেই পরিস্থিতি দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশকে দুর্বল করে দিয়েছে।
‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার
বর্তমান সরকারের লক্ষ্য তুলে ধরে নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, অতীতের সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তরুণ সমাজকে মাদকাসক্তি ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে দূরে রেখে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ইতিবাচক সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়াই সরকারের লক্ষ্য।
মন্ত্রী বলেন, “আমরা একটি নবজাগরণের বাংলাদেশ গড়তে চাই। শুধু কুষ্টিয়া নয়, সারা দেশের তরুণদের অন্ধকার থেকে বের করে এনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি ইতিবাচক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাই।”
লালনের মাজার ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় অবস্থিত লালন শাহর মাজার বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। প্রতিবছর এখানে লালনের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দেশ-বিদেশের হাজারো বাউল, শিল্পী, গবেষক ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। বাউল দর্শন, লোকসংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক হিসেবে লালনের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থান দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত।
তবে সংসদে উত্থাপিত প্রশ্নের মাধ্যমে মাজার এলাকা ঘিরে নিরাপত্তা, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচি বা বিশেষ অভিযান ঘোষণার কথা জানানো হয়নি, তবে সংস্কৃতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে জাতীয় পর্যায়ে মাদকবিরোধী পরিকল্পনার আওতায় কুষ্টিয়ার এই এলাকাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
মন্ত্রীর বার্তা
সংসদে আলোচনার সারাংশ হিসেবে সংস্কৃতিমন্ত্রী জানান, লালনের মাজার এলাকা নিয়ে উত্থাপিত উদ্বেগকে সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। তবে আলাদা কোনো কর্মসূচির পরিবর্তে সারা দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং তরুণ সমাজকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার মধ্য দিয়েই সমস্যার সমাধান খোঁজা হচ্ছে। তাঁর মতে, একটি সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তিই দীর্ঘমেয়াদে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের প্রধান উপায়।