
দেশের শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতা বিকাশে প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে আয়োজন করা হচ্ছে ‘স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং প্রোগ্রাম’। আগামীকাল শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি উপজেলা, জেলা ও জাতীয়—তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হবে। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ উদ্যোগকে দেশের শিক্ষা খাতে সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনভিত্তিক শিক্ষার নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এডুকেশনাল এক্সিলেন্স সাপোর্ট স্কিমের আওতায় এই আয়োজন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আয়োজকদের মতে, মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধান, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধান ও উদ্ভাবনী দক্ষতা বিকাশে এ কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনের বিকাশে নতুন উদ্যোগ
শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষার সমালোচনা রয়েছে। সেই বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে বিজ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন এবং বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধানমুখী চিন্তার সুযোগ তৈরি করাই এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।
মাউশির কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু বিজ্ঞান প্রকল্প প্রদর্শন নয়, বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা তৈরি, স্থানীয় সমস্যার স্থানীয় সমাধান উদ্ভাবন এবং নতুন স্টার্টআপ ধারণা বিকাশেও এই প্রতিযোগিতা সহায়ক হবে।
৫২০ উপজেলায় একযোগে শুরু
এডুকেশনাল এক্সিলেন্স সাপোর্ট স্কিমের প্রোগ্রাম অফিসার তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী জানিয়েছেন, প্রথম ধাপে শুক্রবার দেশের ৫২০টি উপজেলা ও মহানগর শিক্ষা থানায় মেলার আদলে প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।
স্থানীয় পর্যায়ের এসব আয়োজনে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। অংশগ্রহণকারী দলগুলো তাদের বিজ্ঞান প্রকল্প, স্টার্টআপ পরিকল্পনা এবং উদ্ভাবনী ধারণা উপস্থাপন করবে।
তিনি জানান, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে একাধিক দল অংশগ্রহণের সুযোগ থাকায় নিবন্ধিত দলের সংখ্যা লক্ষাধিক ছাড়িয়েছে।
প্রতিটি দলে তিনজন শিক্ষার্থী ও দুজন শিক্ষক অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
ধাপে ধাপে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা
প্রতিযোগিতার কাঠামো তিন স্তরে বিভক্ত করা হয়েছে।
উপজেলা ও থানা পর্যায়ে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলগুলো পুরস্কৃত হবে এবং জেলা পর্যায়ের জন্য নির্বাচিত হবে।
পরবর্তী ধাপে আগামী ১৪ জুন জেলা ও মহানগর পর্যায়ের প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। সেখান থেকে সারা দেশের সেরা ১০০টি দল বাছাই করা হবে।
এরপর ২৮ জুন রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত অনুষ্ঠান। সেখানে নির্বাচিত ১০০টি দল তাদের উদ্ভাবনী প্রকল্প, বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধান এবং স্টার্টআপ ধারণা উপস্থাপন করবে।
চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা থেকে সেরা ১০টি দল নির্বাচন করা হবে।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী শিক্ষার্থীদের প্রত্যেক দলকে ২০ হাজার টাকা এবং সনদপত্র দেওয়া হবে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা পাবেন ৩০ হাজার টাকা ও সনদপত্র।
আয়োজকদের মতে, আর্থিক পুরস্কারের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পাওয়া শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমে উৎসাহ জোগাবে।
স্থানীয় সমস্যা সমাধানে গুরুত্ব
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল মনে করেন, এই কর্মসূচির অন্যতম বড় অর্জন হবে স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা চিহ্নিত করে তার কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করার সুযোগ সৃষ্টি।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা নিজেদের এলাকার বাস্তব সমস্যাগুলোকে কেন্দ্র করে উদ্ভাবনী ধারণা ও প্রকল্প তৈরি করতে পারবে। এর ফলে শুধু বিজ্ঞানচর্চা নয়, বাস্তবমুখী চিন্তা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাও বাড়বে।
মহাপরিচালকের ভাষ্য, এ আয়োজনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায় থেকে নতুন প্রজন্মের উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ধারণা ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম সৃষ্টি হবে।
নতুন প্রজন্মের উদ্ভাবকদের খোঁজে
বিশেষজ্ঞদের মতে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কেবল পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সৃজনশীলতা, প্রযুক্তি দক্ষতা, গবেষণামনস্কতা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা। এই বাস্তবতায় স্টার্টআপ, বিজ্ঞান প্রকল্প ও উদ্ভাবনী ধারণা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের এমন উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করবে এবং ভবিষ্যতের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির জন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা আশা করছেন, এ কর্মসূচি নিয়মিত আয়োজনের মাধ্যমে দেশের স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে বিজ্ঞানচর্চা, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা সংস্কৃতির বিকাশে নতুন গতি সৃষ্টি হবে।