প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 13, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 13, 2026 ইং
বাজেট অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন: অর্থমন্ত্রী

রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট-উত্তর এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন বাজেটকে সম্পূর্ণরূপে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার দর্পণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, দেশের সীমিত সম্পদ এবং ভঙ্গুর অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যেও সমাজের প্রতিটি শ্রেণী-পেশার মানুষকে এই বাজেটের আওতায় নিয়ে আসার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। অতীতে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কিছু নির্দিষ্ট সুবিধাভোগী মহলের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এবার সাধারণ নাগরিকদের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত অর্থনীতির বিভিন্ন খাত, ব্যাংকিং সংস্কার এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস ও ‘ক্রাউডিং আউট’ রোধ
এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার স্থানীয় ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার প্রচলিত ধারা থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে চায়। স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের বেশি ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ কমিয়ে দেয়, যা অর্থনীতির ভাষায় ‘ক্রাউডিং আউট’ নামে পরিচিত। অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এই বিষয়ে যোগ করেন যে, চলতি অর্থবছরে সরকারের ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে নতুন বাজেটে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঋণনির্ভরতা কমাতে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রিন বন্ড ও অরেঞ্জ বন্ড চালুর পাশাপাশি দেশীয় পুঁজিবাজারকে চাঙ্গা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় রেখে দুর্নীতি রোধে বেতন সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেন অর্থমন্ত্রী।
পূর্বাচলে ১৬০ একর জমিতে ‘ক্রিয়েটিভ সেন্টার’
দেশের সংস্কৃতি, বিনোদন ও পর্যটন খাতকে অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করতে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ ধারণার আওতায় একটি মেগা প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে। পূর্বাচলে ১৬০ একর জায়গা জুড়ে একটি সমন্বিত ‘ক্রিয়েটিভ সেন্টার’ গড়ে তোলা হবে, যেখানে থিয়েটার, শিল্পকলা ও সৃজনশীল বিনোদনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে। অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, এই মুহূর্তে বিদেশি পর্যটকদের চেয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ বিশাল পর্যটন বাজারকে শক্তিশালী অবকাঠামো দেওয়া গেলে তা কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতি সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখবে।
কালো টাকা ও ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বিভ্রান্তির অবসান
সংবাদ সম্মেলনে কর ও ব্যাংকিং খাতের দুটি বড় বিতর্কিত বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করেন:
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নেই: এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান স্পষ্ট করেন যে, বাজেটে কালো টাকা বৈধ করার কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি। মূলত জমি বা সম্পত্তি কেনাবেচার সময় প্রকৃত মূল্য গোপন করার জটিলতা দূর করতে এই প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈধ লেনদেনের প্রমাণ সাপেক্ষে নিয়মিত করের সাথে অতিরিক্ত ২০ শতাংশ কর দিয়ে নথিতে প্রকৃত মূল্য প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকে হস্তক্ষেপের অভিযোগ গুজব: বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান দাবি করেন, একটি বিশেষ মহল ইসলামী ব্যাংককে অস্থির করার চেষ্টা চালাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো অযাচিত হস্তক্ষেপ বা ঋণের নির্দেশ দেয়নি। আমানতকারীদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ব্যাংকে পর্যাপ্ত তারল্য সহায়তা দেওয়া হবে এবং আমানতের টাকা তুলতে কোনো সমস্যা হবে না। এছাড়া পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর চেষ্টা চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থ পাচারকারীদের শান্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না।
হরমুজ সংকট ও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালির সংকটের মধ্যেও দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হয়েছে। বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের বকেয়া রয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা, যা পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করা হচ্ছে। এছাড়া ক্যাপাসিটি চার্জ হঠাৎ বন্ধ করলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে বলে তিনি জানান। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সমুদ্র ও স্থলভাগে নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আগামী এক মাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র (টেন্ডার) প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে বলে মন্ত্রী আশ্বস্ত করেন।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বার্তা এক্সপ্রেস