
যুক্তরাজ্যের লন্ডনের নিউহাম কাউন্সিলের নির্বাহী মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরহাদ হোসেন। তিনি নিউহামের প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নির্বাহী মেয়র এবং যুক্তরাজ্যের মূলধারার একটি বড় রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নির্বাহী মেয়র হিসেবেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্পর্শ করেছেন।
গত ৭ মে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন Labour Party কিছু আসনে ধাক্কা খেলেও নিউহামে জয় পান ফরহাদ হোসেন। তাঁর এই জয়কে স্থানীয় রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনের পর এক সাক্ষাৎকারে ফরহাদ হোসেন তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা, অভিবাসী জীবনের অভিজ্ঞতা, নিউহামের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন।
“মেয়র হওয়ার স্বপ্ন ছিল না, ছিল কমিউনিটি সেবা”
নিজের শুরুর দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে ফরহাদ হোসেন বলেন, নিউহামে বেড়ে ওঠার সময় কখনোই তাঁর লক্ষ্য কাউন্সিলর বা মেয়র হওয়া ছিল না।
তিনি বলেন, “আমার মূল মনোযোগ সব সময় ছিল কমিউনিটির সেবা করা। একজন অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে এই যাত্রা দেখায় যে নিউহাম মানুষকে কী ধরনের সুযোগ দিতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, কঠোর পরিশ্রম, কমিউনিটির সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং জনসেবার প্রতি অঙ্গীকার—এই তিনটি বিষয়ই যেকোনো মানুষকে নেতৃত্বের জায়গায় পৌঁছে দিতে পারে, পটভূমি যাই হোক না কেন।
“আমি আমার বাংলাদেশি পরিচয়ে গর্বিত”
নিজের পরিচয় নিয়ে ফরহাদ হোসেন বলেন, তিনি তাঁর বাংলাদেশি শিকড় নিয়ে গর্বিত।
তিনি বলেন, “আমি আমার শিকড় নিয়ে গর্বিত। যেসব বাসিন্দা আমার ওপর আস্থা রেখেছেন, তাঁদের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ। আমার লক্ষ্য সবসময়ই নিউহামের সব মানুষের মেয়র হওয়া।”
“ভোটাররা স্থানীয় ইস্যুকেই গুরুত্ব দিয়েছেন”
জাতীয় পর্যায়ে লেবার পার্টির কিছু রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকলেও নিউহামে তাঁর বিজয় প্রসঙ্গে ফরহাদ হোসেন বলেন, ভোটাররা ব্যক্তি ও স্থানীয় ইস্যু—দুটোই বিবেচনায় নিয়েছেন।
তিনি বলেন, “বাসিন্দারা রাজনৈতিক বাগ্বিতণ্ডার চেয়ে আবাসন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ সড়ক ও উন্নত সেবার মতো বাস্তব সমস্যার সমাধান চেয়েছেন।”
তাঁর মতে, এই ফলাফল স্থানীয় নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থার প্রতিফলন।
“সব দলের সঙ্গে কাজ করাই হবে মূল লক্ষ্য”
নিউহামে কাউন্সিলের রাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তিত হওয়ায় গ্রিন পার্টি ও নিউহাম ইনডিপেনডেন্টস গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে ঐকমত্য গঠন নিয়ে ফরহাদ হোসেন বলেন, তিনি সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।
তিনি বলেন, “যেখানে সাধারণ স্বার্থ রয়েছে, সেখানে আমি সব কাউন্সিলর ও স্বতন্ত্র সদস্যদের সঙ্গে কাজ করতে চাই। আবাসন, জননিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও সেবার ক্ষেত্রে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারি।”
প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকার
নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ১০০ দিনের পরিকল্পনা নিয়ে ফরহাদ হোসেন তিনটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন—
প্রথমত, পাড়া-মহল্লাভিত্তিক পরিষেবা ও রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা উন্নত করা।
দ্বিতীয়ত, ন্যায্য ও মানবিক পার্কিং নীতি বাস্তবায়ন।
তৃতীয়ত, পুলিশ ও স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে কমিউনিটি নিরাপত্তা জোরদার করা।
তিনি বলেন, এই বিষয়গুলোই নির্বাচনী প্রচারণার সময় মানুষের প্রধান উদ্বেগ ছিল।
আবাসন ও জননিরাপত্তা নিয়ে পরিকল্পনা
নিউহামের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলোর মধ্যে আবাসন সংকট ও জননিরাপত্তা অন্যতম। এ বিষয়ে ফরহাদ হোসেন বলেন, বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, “আরও সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ করতে হবে, অসাধু বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং অতিরিক্ত ভিড়ের বাসস্থান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।”
এ ছাড়া অবৈধ ময়লা ফেলা, রাস্তার পরিচ্ছন্নতা এবং পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে অপরাধ দমনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তরুণদের জন্য পরামর্শ
রাজনীতিতে আসতে আগ্রহী ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণদের উদ্দেশে ফরহাদ হোসেন বলেন, শুরু থেকেই কমিউনিটিতে সম্পৃক্ত হওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, “স্বেচ্ছাসেবী কাজ করুন, স্থানীয় সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকুন, ব্যর্থতায় হতাশ হবেন না। নেতৃত্বের শুরু হয় নিজের কমিউনিটির সেবা থেকে।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা
ভবিষ্যতে মানুষ তাঁকে কীভাবে মনে রাখবে—এ প্রশ্নে ফরহাদ হোসেন বলেন, তাঁর লক্ষ্য নিউহামকে আরও পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, ন্যায়সংগত ও ঐক্যবদ্ধ একটি বরো হিসেবে গড়ে তোলা।
তিনি বলেন, “আমি চাই মানুষ বলুক, আমি নিউহামকে উন্নত করেছি। বাসিন্দারা তাঁদের এলাকার ওপর গর্ব অনুভব করুক।”
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরহাদ হোসেনের এই উত্থান শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁর নেতৃত্বে নিউহামের ভবিষ্যৎ নীতি কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।