
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তিনটি প্রধান সংকট রয়েছে—দুর্নীতি, দুর্বল দলীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং নারীর সীমিত প্রতিনিধিত্ব। এমন মূল্যায়ন করেছেন যুক্তরাজ্যের নটিংহ্যাম ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক ফার্নান্দো ক্যাসাল বের্তোয়া। তাঁর মতে, এসব সমস্যা মোকাবিলায় রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে অর্থায়ন (পাবলিক ফান্ডিং) চালু করা একটি কার্যকর নীতি হতে পারে।
বুধবার ঢাকার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে তিনি ‘মানি ইন পলিটিকস: পার্টি ফাইন্যান্সিং অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সেমিনারটি যৌথভাবে আয়োজন করে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ইতিহাস ও দর্শন এবং রাজনীতি বিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্ব বিভাগ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণ
ফার্নান্দো বের্তোয়া তাঁর গবেষণায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বিশ্বের ৫৮টি বড় গণতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক অবাধ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের পর বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে, যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে এই সম্ভাবনার মধ্যেই গভীর কাঠামোগত সমস্যাও রয়ে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রথম সংকট: রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি
গবেষণাপত্রে দুর্নীতিকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দুর্নীতি ধারণা সূচকের তথ্য উদ্ধৃত করে ফার্নান্দো বের্তোয়া বলেন, বাংলাদেশ এখনো বিশ্বের উচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে অবস্থান করছে।
তিনি আরও বলেন, দুর্নীতির সমস্যা শুধু প্রশাসনিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; রাজনৈতিক দুর্নীতি আরও গভীরভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রোথিত। ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্রেসি (V-Dem) ডেটাসেটের তথ্য বিশ্লেষণ করে তিনি দাবি করেন, অনেক গণতান্ত্রিক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে রাজনৈতিক দুর্নীতির মাত্রা উদ্বেগজনক।
দ্বিতীয় সংকট: দুর্বল দলীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো
ফার্নান্দো বের্তোয়ার মতে, শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল অপরিহার্য। ইউরোপের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য দলীয় কাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো এখনো পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। ফলে নেতৃত্ব নির্বাচন, প্রার্থী বাছাই এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নিয়মভিত্তিক স্থায়ী কাঠামো গড়ে ওঠেনি। এর ফলে দলীয় রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে।
তৃতীয় সংকট: নারীর সীমিত রাজনৈতিক অংশগ্রহণ
নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ঘাটতিকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন এই গবেষক। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সংসদে নারীর অংশগ্রহণ এখনও তুলনামূলকভাবে কম, যা শুধু লিঙ্গসমতার বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার মানের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, সংসদে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়, দুর্নীতি কমে এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ হ্রাস পায়।
সমাধান হিসেবে রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক অর্থায়ন
উল্লিখিত তিন সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে ফার্নান্দো বের্তোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন চালুর প্রস্তাব দেন।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত পাবলিক ফান্ডিং রাজনৈতিক দলকে শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়তা করে এবং দলীয় ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করে। পাশাপাশি এটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বাড়ায়, মেরুকরণ কমায় এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন নতুন ও ছোট দলগুলোকেও টিকে থাকার সুযোগ করে দিতে পারে, যা গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতাকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করে।
করপোরেট অনুদান ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে সতর্কতা
ফার্নান্দো বের্তোয়া করপোরেট অনুদানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন। তাঁর মতে, কোম্পানিগুলো সাধারণত জনস্বার্থ নয়, নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করে। তাই রাজনৈতিক দলকে করপোরেট অনুদান দেওয়া গণতান্ত্রিক সমতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি বলেন, বিদেশি অনুদান, তৃতীয় পক্ষের অর্থায়ন, ঋণভিত্তিক অর্থায়ন এবং নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা—সব ক্ষেত্রেই আইনি কাঠামো আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন চালু করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এর সঙ্গে কঠোর তদারকি, স্বচ্ছ হিসাব-নিকাশ, নিয়মিত প্রতিবেদন, স্বাধীন পর্যবেক্ষণ এবং কার্যকর শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। তাঁর ভাষায়, “শুধু গাজর নয়, লাঠিও প্রয়োজন।”
বাংলাদেশে রাজনীতি ‘লাভজনক ব্যবসা’ হয়ে উঠেছে: বদিউল আলম মজুমদার
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আদর্শগতভাবে রাজনীতি জনসেবার মাধ্যম হলেও বাংলাদেশে তা ধীরে ধীরে লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, ক্ষমতা এখন অনেকের জন্য সম্পদ ও প্রভাব বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিভিন্ন নির্বাচনী হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অনেক রাজনৈতিক নেতার সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো এখনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো সিন্ডিকেটের মতো কাজ করে, যেখানে অর্থ ও প্রভাবের বিনিয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
তিনি দলীয় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের দুর্বলতা, নেতৃত্বে বংশানুক্রমিক প্রভাব এবং নীতি-আদর্শের পরিবর্তে ব্যক্তি ও প্রতীকের আধিপত্যের বিষয়গুলোও তুলে ধরেন।
রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের আগে সংস্কারের তাগিদ
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন ভবিষ্যতে বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে তার আগে দলীয় কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা জরুরি।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনসহ নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বল তদারকির কারণে বিদ্যমান অনিয়ম আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সেমিনারের অন্যান্য আলোচনা
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ইতিহাস ও দর্শন বিভাগের চেয়ার অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের সঞ্চালনায় সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন স্কুল অব হিউম্যানিটিস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেসের ডিন অধ্যাপক মো. রিজওয়ানুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য নেছার উদ্দিন আহমেদ এবং স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিম। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন রাজনীতি বিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্ব বিভাগের চেয়ার রিজওয়ান খায়ের।
সেমিনারে বক্তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি, দলীয় কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ সংস্কার নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।