
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি অবসানের দিকে এগোচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)। স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও পরবর্তী শান্তিচুক্তির ভিত্তি গঠনের উদ্দেশ্যে এই সমঝোতায় সই করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি ও আল–জাজিরার প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
ভার্সাই প্রাসাদে ট্রাম্পের সই
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ঐতিহাসিক ভার্সাই প্রাসাদে অবস্থানকালে সমঝোতা স্মারকে সই করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরে প্রাসাদ ছাড়ার আগে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “এটা সই হয়েছে। আমি ভার্সাইতে মাত্রই এটাতে সই করেছি।”
ট্রাম্প বর্তমানে জি–৭ শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে ফ্রান্স সফরে রয়েছেন।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ট্রাম্পের সই করার একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। পোস্টে তিনি লেখেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভার্সাইয়ে আজ রাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চুক্তিতে সই করেছেন।”
ইরানের নিশ্চিতকরণ ও ইলেকট্রনিক সই
ইরান সরকারও সমঝোতা স্মারকে সইয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা ইরনাকে জানান, দুই দেশের প্রেসিডেন্ট দূরবর্তী অবস্থান থেকে ইলেকট্রনিকভাবে এই সমঝোতায় সই করেন।
তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্টের সই করার মধ্য দিয়ে খসড়া সমঝোতা চূড়ান্ত হয়েছে। এখন বাস্তবায়ন যাচাইয়ের সময় এসেছে।”
বাঘাই আরও জানান, এটি কোনো আনুষ্ঠানিক সমাবেশ বা একক স্থানে সইয়ের মাধ্যমে হয়নি, বরং ডিজিটাল পদ্ধতিতে চূড়ান্ত করা হয়েছে।
আগের পরিকল্পনা ও পরিবর্তিত সময়সূচি
এর আগে সুইজারল্যান্ড সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, শুক্রবার (১৯ জুন) লুসার্ন হ্রদের পাহাড়ি এলাকায় একটি বিলাসবহুল হোটেলে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার বাঘের গালিবাফের উপস্থিত থাকার কথা ছিল।
তবে এক দিন আগেই দুই দেশ এই সমঝোতা স্মারকে সই করার সিদ্ধান্ত নেয়।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ও ঘোষণা
এই সমঝোতা প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, সমঝোতা অবিলম্বে কার্যকর হবে।
তিনি বলেন, এ চুক্তির প্রথম ধাপে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সমঝোতার মূল কাঠামো ও ধাপ
গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন ১৪ দফা সমঝোতা নথির বিষয়বস্তু প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, এই সমঝোতার মাধ্যমে:
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে
ইরানের ওপর নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার পথ খোলা রাখা হবে
ধাপে ধাপে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন করা হবে
এ ছাড়া সমঝোতা বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইরানের অবস্থান ও কূটনৈতিক বার্তা
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরের কারণে এই সমঝোতা লঙ্ঘন করা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে।
তিনি বলেন, অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে ইরান চেয়েছে চুক্তিটি এমনভাবে সম্পন্ন হোক, যাতে এর বাস্তবায়ন ও দায়বদ্ধতা সুস্পষ্ট থাকে।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল ও জ্বালানি পরিবহন পথগুলোর একটি। এই প্রণালির স্থিতিশীলতা বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে এর পুনরায় উন্মুক্ত হওয়াকে আন্তর্জাতিক বাজারে একটি বড় ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, তবে এর বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক স্থায়িত্ব এখনো বড় প্রশ্ন হিসেবে রয়ে গেছে।
পরবর্তী ধাপ
চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা চলবে। এই সময়ের মধ্যে উভয় পক্ষ সমঝোতা বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপ নির্ধারণ করবে বলে জানা গেছে।