
মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত করা দীর্ঘ সংঘাতের অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে অতিক্রম করেছে সৌদি আরবের তিনটি সুপারট্যাংকার। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এই ট্যাংকারগুলোতে প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহন করা হচ্ছিল।
চুক্তির ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও লেবাননে চলমান সংঘাত নতুন করে আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়িয়েছে। ইসরায়েলি বিমান হামলায় সেখানে একদিনেই নতুন করে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি খুলতেই বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব
চুক্তি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে খুলে দেওয়ার ঘোষণা আসে এবং একই সঙ্গে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনটি সৌদি সুপারট্যাংকার প্রণালি অতিক্রম করে, যা বাজারে দ্রুত ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শিপিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, যদিও প্রণালিতে চলাচল শুরু হয়েছে, তবে পূর্ণ স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরতে আরও সময় লাগবে। কারণ এখনো মাইন অপসারণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ চলমান রয়েছে।
এর আগে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক জাহাজ নিজেদের অবস্থান গোপন রাখছিল। তবে নতুন পরিস্থিতিতে তারা আবার ট্রান্সপন্ডার চালু করে অবস্থান প্রকাশ করছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ ডলারের নিচে নেমে এসেছে—যা সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যে সর্বনিম্ন।
৬০ দিনের আলোচনার রূপরেখা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকে আগামী ৬০ দিনের একটি আলোচনা পর্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে যুদ্ধের চূড়ান্ত রাজনৈতিক নিষ্পত্তির চেষ্টা চালানো হবে।
চুক্তির পেছনের প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরাসরি অংশগ্রহণ ছিল বলে জানা গেছে। চুক্তিটি কার্যত দ্রুত কার্যকর হওয়ায় কূটনৈতিক মহলে বিস্ময় তৈরি হয়েছে।
লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন শর্ত
এই চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—লেবানন সংঘাতকে সরাসরি আলোচনার অংশ করা। নথিতে লেবাননে যুদ্ধের ‘স্থায়ী অবসান’ এবং দেশটির সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার বিষয় উল্লেখ রয়েছে।
এটিকে ইরানের দীর্ঘদিনের অবস্থানের একটি কূটনৈতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে তেহরান শুরু থেকেই বলছিল যে লেবাননকে বাদ দিয়ে কোনো স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়।
তবে ইসরায়েল এই আলোচনায় সরাসরি অংশ নেয়নি, যা নিয়ে আঞ্চলিক কূটনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে।
লেবাননে সংঘাত অব্যাহত
চুক্তির ঘোষণা সত্ত্বেও লেবাননে সহিংসতা থামেনি। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, ইসরায়েলি বিমান হামলায় দক্ষিণ লেবাননের কাফারতেবনিত ও জেবদাইন শহরে তিনজন নিহত হয়েছেন।
এছাড়া রাজধানী বৈরুত ও দক্ষিণ উপকণ্ঠে ইসরায়েলি ড্রোনের উপস্থিতি দেখা গেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা।
লেবাননে ইতোমধ্যে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে মানবিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
ইসরায়েলের অবস্থান ও মার্কিন ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ইসরায়েল জানিয়েছে, লেবাননে তাদের সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। দেশটির নতুন প্রকাশিত মানচিত্রে দক্ষিণ লেবাননের একটি বিস্তৃত অঞ্চলকে “বাফার জোন” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বিষয়ে দর-কষাকষি চলছে, তবে কোনো সমঝোতা চূড়ান্ত হয়নি। তারা আরও দাবি করেন, পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থানের ওপর।
অন্যদিকে ওয়াশিংটন থেকে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক কৌশল নিয়ে প্রকাশ্য সমালোচনাও এসেছে। ট্রাম্প নিজেও ইঙ্গিত দিয়েছেন, লেবাননে অতিরিক্ত ধ্বংসযজ্ঞ শান্তি প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বাজার, যুদ্ধ ও কূটনীতির তিনমুখী চাপ
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্বস্তি দিলেও লেবাননের পরিস্থিতি এখনো বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কূটনৈতিকভাবে যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাত অব্যাহত থাকায় পুরো অঞ্চল এখনো উচ্চমাত্রার অনিশ্চয়তায় রয়েছে।
ফলে চুক্তি সই হওয়ার পরও মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির পথ এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি—বরং নতুন বাস্তবতা ও নতুন সংঘাতের সমান্তরাল গতিপথ তৈরি হয়েছে।