
ভারতের মেডিকেল কলেজে ভর্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট–আন্ডারগ্র্যাজুয়েট (নিট-ইউজি) পুনরায় আয়োজনের আগেই তৈরি হয়েছে নতুন এক বিভ্রান্তি। মহারাষ্ট্রের নাগপুর জেলার এক শিক্ষার্থীর পরীক্ষাকেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে ভারতের বাইরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবির একটি বিদ্যালয়ে। প্রবেশপত্রে বিদেশি পরীক্ষাকেন্দ্র দেখে হতবাক হয়ে গেছেন ওই শিক্ষার্থী ও তাঁর পরিবার।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে বাতিল হওয়া পরীক্ষার পুনঃআয়োজনের আগে এমন ঘটনায় পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভারতের ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) জানিয়েছে, এটি তাদের প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে হয়েছে এবং দ্রুত সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম The Hindu–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাগপুরের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তালিব প্রবেশপত্র ডাউনলোড করার পর দেখতে পান, তাঁর পরীক্ষাকেন্দ্র ভারতের কোনো শহরে নয়, বরং আবুধাবির একটি ভারতীয় স্কুলে নির্ধারণ করা হয়েছে।
আবদুল্লাহ ভারতের নাগপুর থেকেই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। আবেদনের সময় তিনি পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে নাগপুর, ওয়ার্ধা ও ভান্ডারা শহরকে পছন্দের তালিকায় রেখেছিলেন। কিন্তু প্রবেশপত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন দেশে পরীক্ষাকেন্দ্র উল্লেখ থাকায় তিনি সমস্যায় পড়েন।
সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় তাঁর ভ্রমণসংক্রান্ত কারণে। আবদুল্লাহর পরিবারের ভাষ্য, তাঁর কোনো পাসপোর্ট নেই। ফলে বিদেশে গিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
আবদুল্লাহর বাবা চিকিৎসক মোহাম্মদ তালিব বলেন, “প্রবেশপত্র দেখে আমরা হতবাক হয়ে গেছি। আমার ছেলে কাঁদতে শুরু করেছিল। তার তো পাসপোর্টই নেই।”
এনটিএর ব্যাখ্যা, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সংশোধনের আশ্বাস
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রবেশপত্রের একটি ছবিতে আবুধাবির ভারতীয় একটি স্কুলকে পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে দেখা যায়। বিষয়টি আলোচনায় আসার পর এনটিএর নজরে আনা হয়।
এনটিএ জানায়, অভিযোগ যাচাই করে দেখা গেছে, এটি একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে হয়েছে। সংস্থাটি ওই শিক্ষার্থীকে নাগপুরে একটি পরীক্ষাকেন্দ্র দেওয়ার ব্যবস্থা করবে এবং সংশোধিত প্রবেশপত্র প্রকাশ করবে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে আগের পরীক্ষা বাতিল হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় নিট-ইউজি আয়োজন করছে এনটিএ। আগামী ২১ জুন লাখ লাখ শিক্ষার্থী আবার পরীক্ষায় অংশ নেবেন।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে বাতিল হয়েছিল আগের পরীক্ষা
ভারতের মেডিকেল শিক্ষায় ভর্তির জন্য সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোর একটি নিট-ইউজি। এর মাধ্যমে দেশটির সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজে স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়।
চলতি বছরের ৩ মে ভারতজুড়ে পাঁচ হাজারের বেশি কেন্দ্রে নিট-ইউজি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন প্রায় ২২ লাখ ৮০ হাজার পরীক্ষার্থী। তবে পরীক্ষা শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পরে কেন্দ্রীয় সরকার পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় এবং পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা দেয়।
ঘটনার তদন্ত করছে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা Central Bureau of Investigation (সিবিআই)। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
দ্বিতীয় দফার পরীক্ষাকে ঘিরে বাড়তি সতর্কতা
পুনঃপরীক্ষাকে ঘিরে নিরাপত্তা ও প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে বাড়তি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে ভারত সরকার সাময়িকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রাম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এনটিএর তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষায় লাখো শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের কারণে কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটিমুক্ত পরিচালনা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আগেও বিতর্কে পড়েছিল নিট
এর আগেও নিট পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ২০২৪ সালের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, অস্বাভাবিক বেশি নম্বর পাওয়া এবং গ্রেস নম্বর দেওয়ার বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
সেবার হাজারো পরীক্ষার্থী অস্বাভাবিকভাবে বেশি নম্বর পাওয়ায় পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়।
বারবার অনিয়মের অভিযোগের কারণে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ভর্তি পরীক্ষা এখন প্রশাসনিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত নির্ভুলতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বড় পরীক্ষার মুখে রয়েছে।