
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক সংঘাত শুধু আঞ্চলিক রাজনীতিতেই নয়, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেও বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সবচেয়ে বেশি কৌশলগত লাভ হয়েছে চীনের—এমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা।
একাধিক পশ্চিমা ও চীনা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে CNN জানিয়েছে, সংঘাত শুরুর সময় বেইজিং উদ্বিগ্ন থাকলেও কয়েক মাসের ব্যবধানে পরিস্থিতি চীনের জন্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থায় রূপ নেয়।
যুদ্ধ শুরুর সময় চীনের উদ্বেগ
সংঘাতের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয় বেইজিংয়ে। চীনের শীর্ষ নেতৃত্ব আশঙ্কা করছিল, ইরান সরকার পতনের দিকে যেতে পারে—যা ভেনেজুয়েলায় ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা এবং যুদ্ধবিরতির পথে অগ্রগতি চীনকে নতুন কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করে দেয়।
জ্বালানি সংকটে চীনের কৌশলগত সুবিধা
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের সময় চীন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ—
বিপুল কৌশলগত তেল মজুত
বিকল্প জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ
বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে চীন এই সংকটকে দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পেরেছে, যেখানে অনেক পশ্চিমা ও প্রতিবেশী দেশ বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে।
কূটনৈতিকভাবে ‘শান্তির মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে উত্থান
যুদ্ধ চলাকালে চীন একাধিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও কূটনীতিকদের আতিথেয়তা দিয়েছে এবং নিজেকে “শান্তির পক্ষের শক্তি” হিসেবে তুলে ধরেছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত।
মুখপাত্র লিন জিয়ান সরাসরি কোনো মধ্যস্থতার দাবি না করলেও বলেন, বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই শান্তি প্রতিষ্ঠায় “অক্লান্ত চেষ্টা” চালিয়ে যাচ্ছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের প্রস্তাবিত চার দফা শান্তি পরিকল্পনাকেও এই কূটনৈতিক অবস্থানের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্পের মন্তব্য ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
সাম্প্রতিক এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরান সংকট সমাধানে চীনের ভূমিকা ইতিবাচক ছিল। তিনি চীন ও প্রেসিডেন্ট সি–কে “নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার” জন্য ধন্যবাদ জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের মন্তব্য চীনের কূটনৈতিক অবস্থানকে আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও বৈধতা দিয়েছে।
সীমিত কিন্তু কৌশলগত অংশগ্রহণ
যুদ্ধ চলাকালে চীন সরাসরি সামরিক কোনো ভূমিকা না নিয়ে বরং ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রেখেছে।
ইরানে হামলার নিন্দা
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা
একই সঙ্গে উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা
এছাড়া ইরানি তেল আমদানি অব্যাহত রেখেও চীন কার্যত অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করেছে।
‘সুয়েজ সংকট’ তুলনা: যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল?
কিছু চীনা ও পশ্চিমা বিশ্লেষক এই সংঘাতকে ১৯৫০-এর দশকের সুয়েজ সংকটের সঙ্গে তুলনা করছেন। তাঁদের মতে, ওই সময় যেমন ব্রিটেনের বৈশ্বিক প্রভাব কমে গিয়েছিল, তেমনি এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যে ফাটল দেখা দিতে পারে।
চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সান দেগাংয়ের মতো বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে আগের মতো এককভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না।
চীনের কৌশল: নীরব লাভের রাজনীতি
চীন সরাসরি কোনো পক্ষ না নিয়ে একটি “নীরব লাভের কূটনীতি” অনুসরণ করেছে বলে বিশ্লেষকদের মত—
একদিকে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায়
অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক অক্ষুণ্ন
আবার পশ্চিমা শক্তির সঙ্গেও সরাসরি সংঘাতে না যাওয়া
এই ভারসাম্য চীনকে এক ধরনের “সর্বজনীন গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতাকারী” হিসেবে তুলে ধরেছে।
বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন
চীনা রাজনৈতিক বিশ্লেষক হু সিজিনের মতে, এই সংঘাত দেখিয়েছে—
জ্বালানি নিরাপত্তায় চীনের প্রস্তুতি কার্যকর
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট
পশ্চিমা জোটের অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও দৃশ্যমান
তাঁর মতে, তাইওয়ানসহ ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক ইস্যুতেও এই সংঘাতের প্রভাব পড়তে পারে।
তবে চীনের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট
তবে সব বিশ্লেষক একমত নন যে চীন এককভাবে বড় বিজয়ী হয়েছে। চীনের তসিংহু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সান চেংহাওয়ের মতে—
যুক্তরাষ্ট্র এখনো মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি
চীনের প্রভাব বাড়লেও তা সীমিত ও শর্তাধীন
বেইজিংয়ের সাফল্য অনেকটাই “অপ্রত্যক্ষ”
তিনি বলেন, শুধু মার্কিন সমালোচনা নয়, বরং বাস্তব কূটনৈতিক সমাধান দিতে পারাই চীনের ভবিষ্যৎ অবস্থান নির্ধারণ করবে।
শেষ কথা: বিজয়ী কি সত্যিই চীন?
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত চীনকে সরাসরি বিজয়ী না করলেও তিনটি বড় অর্জন এনে দিয়েছে—
বৈশ্বিক কূটনীতিতে প্রভাব বৃদ্ধি
জ্বালানি নিরাপত্তায় স্থিতিশীলতা বজায়
যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যের ধারণায় প্রশ্নচিহ্ন
তবে একই সঙ্গে এটি স্পষ্ট করেছে যে চীন এখনো বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর পূর্ণ নেতৃত্ব নেওয়ার অবস্থানে পৌঁছায়নি।
ফলে এই যুদ্ধ চীনের জন্য “বড় বিজয়” না হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।