
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে চলমান একটি মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দিয়েছেন সেনাবাহিনীর সদস্য ইমরুল কায়েস। তাঁর বক্তব্যে সাবেক সামরিক কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে একাধিক ব্যক্তি হত্যার গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।
রোববার ট্রাইব্যুনালে পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন ইমরুল কায়েস। বর্তমানে তিনি রংপুর সেনানিবাসে ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত। তিনি জানান, ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত র্যাব সদর দপ্তরে দায়িত্ব পালনের সময় জিয়াউল আহসানের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন।
সাক্ষ্যের এক পর্যায়ে ইমরুল দাবি করেন, ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহের পর পরিচালিত অভিযানের সময় কয়েকজন পলাতক সদস্যকে আটক করে হত্যা করা হয়। তাঁর ভাষ্যমতে, কিছু ক্ষেত্রে ইনজেকশনের মাধ্যমে এবং কিছু ক্ষেত্রে গুলি করে হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, মরদেহ ভারী বস্তার সঙ্গে বেঁধে পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হতো যাতে সেগুলো ভেসে না ওঠে।
সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করেন ইমরুল। তিনি দাবি করেন, ঘটনার সময় কিছু অস্বাভাবিক তৎপরতা প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং পরে বিষয়টি নিয়ে র্যাব সদর দপ্তরে চাপা উত্তেজনার পরিবেশ দেখেছিলেন। তাঁর বক্তব্যে আরও উঠে আসে যে, ঘটনার পর কিছু নথি ও নজরদারি ফুটেজ নষ্ট করার বিষয়েও তিনি সহকর্মীদের কাছ থেকে শুনেছিলেন।
ইমরুল কায়েসের দাবি, একাধিক অভিযানে আটক ব্যক্তিদের সীমান্ত এলাকা থেকে আনার পর পথেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি বলেন, এসব অভিযানে তিনি সরাসরি উপস্থিত ছিলেন এবং কয়েকটি ঘটনায় মরদেহ ফেলে দেওয়ার ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেছেন।
সাক্ষী আরও অভিযোগ করেন, কয়েকটি অভিযানে আটক ব্যক্তিদের নৌকায় করে নদীর মাঝখানে নিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর মরদেহ ভারী বস্তার সঙ্গে বেঁধে পানিতে ফেলে দেওয়া হতো। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এমন ঘটনার সংখ্যা একাধিক ছিল।
আরেকটি ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, এক রাতে তাঁকে একটি গাড়ি থেকে নামিয়ে একটি মরদেহ রেললাইনের কাছে নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। পরে সেই মরদেহ রেললাইনের ওপর রাখা হয়। তখন তিনি বুঝতে পারেন, এটি স্বাভাবিক কোনো অভিযান ছিল না।
সাক্ষ্য দিতে গিয়ে সুন্দরবনে পরিচালিত কয়েকটি অভিযানের কথাও উল্লেখ করেন ইমরুল। তাঁর দাবি, একটি অভিযানে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি দেখে তাঁর মনে হয়েছিল পুরো বিষয়টি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে। সেখানে কয়েকটি মরদেহ এবং অস্থায়ী ঘাঁটির মতো কিছু কাঠামো দেখতে পান বলে তিনি জানান।
জবানবন্দির শেষ অংশে ইমরুল কায়েস আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, তিনি দেশের সেবা করার জন্য প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, সাধারণ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য নয়। নিজের বিবেকের তাড়নায় আদালতে সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আদালতের কাছে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা জানান এবং সাক্ষ্য দেওয়ার পর নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন করেন। তাঁর ভাষায়, একজন সৈনিক হিসেবে তিনি চান না ভবিষ্যতে আর কাউকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হোক।
উল্লেখ্য, মামলাটিতে জিয়াউল আহসান একমাত্র আসামি। অভিযোগগুলোর বিচারিক সত্যতা নির্ধারণের বিষয়টি বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের বিবেচনায় রয়েছে।