
শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং ঝরে পড়ার হার কমাতে বিদ্যালয়ভিত্তিক অভিভাবক–শিক্ষক পরিষদ (পিটিএ) কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, বিদ্যালয়, পরিবার ও স্থানীয় কমিউনিটির মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে উঠলে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি কমানো, শিক্ষকদের জবাবদিহি বাড়ানো এবং শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা সম্ভব।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব বিদ্যালয়ে পিটিএ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, সেখানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি, ঝরে পড়া কমানো এবং মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কার্যক্রম জোরদার হওয়ার মতো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। তাই দেশের সব বিদ্যালয়ে পিটিএকে কার্যকর করতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও বাস্তবায়ন নির্দেশিকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোববার (২১ জুন ২০২৬) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘পিটিএ শক্তিশালীকরণ এবং শিখন ঘাটতি পূরণে বুনিয়াদি উদ্যোগ: একসঙ্গে শেখা’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি। এতে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং শিক্ষা খাতের অংশীজনেরা অংশ নেন।
ঝরে পড়া কমাতে পিটিএর ভূমিকা
অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় উদ্বেগের বিষয় হলো শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষার আগেই ঝরে পড়া। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি শ্রেণিকক্ষে পাঠ বুঝতে না পারাকে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যাতে পিছিয়ে না পড়ে, সে জন্য শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা এবং ডায়াগনস্টিক অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সরকার বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
ব্র্যাকের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও মাইগ্রেশন কর্মসূচির পরিচালক সাফি রহমান খান বলেন, শিক্ষাব্যবস্থায় টেকসই উন্নয়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে শুধু কেন্দ্রীয় কাঠামোর ওপর নির্ভর করলে হবে না। এর সঙ্গে পরিবার ও কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিশাল শিক্ষাব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে হলে অভিভাবকদের দায়িত্ব ও অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের অংশগ্রহণকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া জরুরি।
পিটিএকে ‘অব্যবহৃত সম্পদ’ হিসেবে দেখছেন শিক্ষা কর্মকর্তারা
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পিইডিপি–৪) মোহাম্মদ আতিকুর রহমান বলেন, পিটিএ শিক্ষা খাতের সবচেয়ে বড় অব্যবহৃত সম্পদগুলোর একটি। এটি কার্যকর করা গেলে বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের জবাবদিহি বাড়বে এবং প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান ও মৌলিক শিখন দক্ষতা অর্জনের পথ সহজ হবে।
তিনি বলেন, অভিভাবকদের সঙ্গে বিদ্যালয়ের নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে শিক্ষার্থীদের সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের কার্যক্রমেও স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ বাড়ে।
ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির প্রোগ্রাম হেড (ডেভেলপমেন্ট) মো. মোয়াজ্জেম হোসেন অনুষ্ঠানে পিটিএ শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের অর্জন তুলে ধরেন। পাশাপাশি তিনি শিখন ঘাটতি পূরণে ‘ক্যাচ–আপ লার্নিং প্রোগ্রাম’ সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের অবহিত করেন।
তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করছে ব্র্যাক। পিটিএ সমাজের প্রতিচ্ছবি। এই অংশকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা গেলে শিক্ষা খাতে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি আরও বাড়বে।
গবেষণায় পিটিএর ইতিবাচক প্রভাব
বিদ্যালয়ে পিটিএর কার্যকারিতা বৃদ্ধি, অভিভাবকদের সচেতনতা তৈরি এবং কমিউনিটির অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্র্যাক ‘পিটিএ শক্তিশালীকরণ প্রকল্প’ পরিচালনা করছে। রংপুর জেলার সদর, বদরগঞ্জ ও পীরগঞ্জ উপজেলার ৪৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
পিটিএ শক্তিশালীকরণের প্রভাব ও সম্ভাবনা নিয়ে ব্র্যাক একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে। এতে ৬০টি বিদ্যালয় ও ৬০০ অভিভাবকের ওপর জরিপ চালানো হয়। পাশাপাশি শিক্ষা কর্মকর্তা, পিটিএ কমিটির সদস্য ও অভিভাবকদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার এবং দলীয় আলোচনার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব বিদ্যালয়ে পিটিএ কার্যকর, সেখানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেড়েছে, ঝরে পড়ার হার কমেছে এবং শিশুশ্রমের প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কার্যক্রমও বৃদ্ধি পেয়েছে।
শিখন ঘাটতি পূরণে ক্যাচ–আপ লার্নিং কর্মসূচি
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণের জন্য ‘ব্র্যাক একসিলারেটেড ক্যাচ–আপ লার্নিং প্রোগ্রাম’ চালু করা হয়েছে। সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি–৫ (পিইডিপি–৫)-এর অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বল্প ব্যয় ও বাস্তবসম্মত মডেল হিসেবে এ কর্মসূচি তৈরি করা হয়েছে।
রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রামের চিলমারী ও গাইবান্ধার ফুলছড়ি, ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুরের বকশীগঞ্জ ও শেরপুরের নালিতাবাড়ী, সিলেট বিভাগের সিলেটের জৈন্তাপুর এবং বরিশাল বিভাগের ভোলার লালমোহন উপজেলায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।
তিন বছর মেয়াদি এ কর্মসূচির আওতায় ৭৩৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যুক্ত হবে। এতে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য শিখন ঘাটতি পূরণে প্রতিকারমূলক (রিকভারি) কার্যক্রম এবং প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিরোধমূলক (প্রিভেনশন) কার্যক্রম রাখা হয়েছে।
ব্র্যাকের এই উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়া, লেখা ও গণিতের দক্ষতায় দ্রুত উন্নতি আনার পাশাপাশি শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অভিভাবক–শিক্ষক অংশীদারত্বের ওপর গুরুত্ব
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির সিনিয়র অ্যাডভাইজার প্রফুল্ল চন্দ্র বর্মণ বলেন, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে অভিভাবক ও শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, অভিভাবকেরা সন্তানের শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হলে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ বাড়ে এবং বিদ্যালয়ের সঙ্গে পরিবারের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়। এই লক্ষ্যেই পিটিএকে নতুনভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যালয়ের উন্নয়ন শুধু শিক্ষক বা প্রশাসনের একক দায়িত্ব নয়। পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমেই একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।