
দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। ২০২৮ সালের শিক্ষাক্রমকে সামনে রেখে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন শিক্ষাক্রমে পারিবারিক মূল্যবোধ, নৈতিক শিক্ষা, নাগরিক দায়িত্ববোধ, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চেতনা এবং জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
তিনি বলেছেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে মূল্যবোধভিত্তিক কাঠামোর ওপর পুনর্গঠন করা হবে। পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের মৌলিক সাক্ষরতা, পাঠদক্ষতা ও সংখ্যাজ্ঞান নিশ্চিত করাকে সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে নেওয়া হয়েছে।
রোববার (২১ জুন ২০২৬) ঢাকার মিরপুরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে প্রাথমিকের শিক্ষাক্রম উন্নয়ন বিষয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। সভায় শিক্ষা খাতের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
২০২৮ সালের শিক্ষাক্রম সংস্কারের প্রস্তুতি
মতবিনিময় সভায় ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘২০২৮ সালের শিক্ষাক্রম সংস্কারের যাত্রা আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো।’ নতুন শিক্ষাক্রম তৈরির ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বাস্তব শেখার সক্ষমতা, পাঠ বোঝার দক্ষতা, গণিতের ভিত্তি এবং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থী শুধু পাঠ্যবই মুখস্থ করবে—এমন শিক্ষা কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে তাকে বুঝে শেখা, নিজের চিন্তা প্রকাশ করা এবং বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীকে কোনো বই পড়তে দিলে সে যেন তা বুঝে পড়তে পারে, নিজের ভাষায় বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পারে এবং শেখার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়—নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নে এ লক্ষ্যকে সামনে রাখা হয়েছে।
নির্ধারিত হবে শিখন ফল ও ‘এক্সিট প্রোফাইল’
নতুন শিক্ষাক্রমে প্রতিটি শ্রেণির জন্য নির্দিষ্ট ‘লার্নিং আউটকাম’ বা শিখন ফল নির্ধারণ করা হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে পঞ্চম শ্রেণি শেষে একজন শিক্ষার্থীর কী ধরনের জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতা অর্জন করা প্রয়োজন, তার একটি নির্দিষ্ট ‘এক্সিট প্রোফাইল’ তৈরি করা হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের অর্জনযোগ্য দক্ষতার ভিত্তিতেই পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষক নির্দেশিকা, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী প্রস্তুত করা হবে। এতে শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি আরও কার্যকরভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাসামগ্রী তৈরির উদ্যোগ
প্রতিমন্ত্রী জানান, নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য ডিজিটাল কনটেন্ট, ভিডিও লেসন এবং বিভিন্ন সহায়ক শিক্ষাসামগ্রী তৈরি করা হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাকে আরও আকর্ষণীয় ও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণভাবে খেলাধুলা, আনন্দ ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষণ পদ্ধতির ওপর পরিচালিত হবে। শিশুদের বয়স ও মানসিক বিকাশ বিবেচনায় নিয়ে শেখার পরিবেশ তৈরি করা হবে।
মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর জোর
নতুন শিক্ষাক্রমে মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ বলেন, একজন শিক্ষার্থীকে শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য নয়, বরং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নৈতিকতার বিষয়গুলো শিক্ষার সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিকতা, দায়িত্বশীলতা ও দেশপ্রেমের বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্য রয়েছে।
অংশীজনদের সমন্বয়ে এগোবে সংস্কার কার্যক্রম
সভায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ), ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি, গণসাক্ষরতা অভিযান এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী প্রস্তুত এবং নিয়মিত মূল্যায়ন ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কার্যকর পরিকল্পনা ও অংশীজনদের সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এ সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।