
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির লক্ষ্য নিয়ে চলমান দ্বিতীয় দফা আলোচনার প্রথম দিনকে ‘ফলপ্রসূ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতার। সুইজারল্যান্ডের লুসার্নে অনুষ্ঠিত এ আলোচনায় দুই পক্ষ আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত রোডম্যাপে পৌঁছানোর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে একমত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সোমবার (২২ জুন ২০২৬) পাকিস্তান ও কাতারের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, আলোচনার জন্য গঠিত ‘হাই লেভেল কমিটি’ আগামী দুই মাসের মধ্যে একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির কাঠামো নির্ধারণে কাজ করবে। এ সময় কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা চলমান থাকবে।
৬০ দিনের রোডম্যাপ ও যোগাযোগ লাইন
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখা এবং ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে একটি নির্দিষ্ট ‘কমিউনিকেশন লাইন’ স্থাপন করার বিষয়ে সম্মতি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ আঞ্চলিক সংঘাত প্রশমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ আস্থা গঠনের উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
উচ্চপর্যায়ের অংশগ্রহণ
সুইজারল্যান্ডের বিউর্গেনস্টক রিসোর্টে অনুষ্ঠিত আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জার্ড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।
অন্যদিকে ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান এবং কাতারের প্রধানমন্ত্রী।
পারমাণবিক ইস্যু ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা
আলোচনায় পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ইস্যু গুরুত্ব পায় বলে জানা গেছে। মার্কিন এক কূটনীতিকের বরাতে জানা যায়, ইরানের কাছ থেকে পাওয়া কিছু অস্পষ্ট বার্তা স্পষ্ট করার ওপর আলোচনা কেন্দ্রিত ছিল।
এছাড়া লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং হিজবুল্লাহ–ইসরায়েল সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও আলোচনা হয় বলে ওই কূটনীতিক জানান।
পূর্ববর্তী চুক্তির প্রেক্ষাপট
গত সপ্তাহে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনায় একটি অনানুষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমে ‘সব ফ্রন্টে’ সংঘাত কমানো এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে অঙ্গীকার করা হয়েছিল। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে দক্ষিণ লেবাননে সহিংসতা অব্যাহত থাকায় চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
শনিবার ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিলেও আন্তর্জাতিক শিপিং ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী ওই রুটে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান পাল্টাপাল্টি অবস্থান
আলোচনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানকে কঠোর সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, লেবাননে প্রক্সি বাহিনীর মাধ্যমে অস্থিরতা তৈরি বন্ধ না করলে ইরানকে কঠোর পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে হবে।
এর জবাবে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিকে অকার্যকর বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, অতীতের হুমকিগুলো বাস্তবায়িত হয়নি এবং বর্তমান পরিস্থিতিও তা প্রমাণ করছে।
আঞ্চলিক অস্থিরতা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
আলোচনায় অগ্রগতি থাকলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, লেবাননের চলমান সংঘাত, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মতপার্থক্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হলেও তার বাস্তবায়ন হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর রয়েছে আলোচনার পরবর্তী ধাপের দিকে, যেখানে স্থায়ী শান্তি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার রূপরেখা কতটা দৃঢ় হয়—তা নির্ধারণ করবে এই প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ।