
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শূন্য পদ পূরণে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী। তিনি জানান, আগামী ছয় মাসের মধ্যে ২ হাজার ৮৭৯টি শূন্য পদে নিয়োগ সম্পন্ন করা হবে।
রোববার (২১ জুন ২০২৬) জাতীয় সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এ তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
তিন ধাপে নিয়োগ পরিকল্পনা
প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী বলেন, সরকারি প্রশাসনের শূন্য পদ পূরণে ছয় মাস, এক বছর এবং পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি জানান, আগামী ছয় মাসের মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন ২ হাজার ৮৭৯টি শূন্য পদে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া এক বছরের মধ্যে আরও ৪ হাজার ৪৫৯টি এবং পাঁচ বছরের মধ্যে অতিরিক্ত ৩ হাজার ১১০টি শূন্য পদ পূরণ করা হবে।
সরকারি পদে বিপুল শূন্যতা
সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেশের সব মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরে মোট ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি শূন্য পদ রয়েছে।
এর মধ্যে—
প্রথম শ্রেণি (৯ম–১ম গ্রেড): ৬৮ হাজার ৮৮৪টি
দ্বিতীয় শ্রেণি (১২তম–১০ম গ্রেড): ১ লাখ ২৯ হাজার ১৬৬টি
তৃতীয় শ্রেণি (১৬তম–১৩তম গ্রেড): ১ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯টি
চতুর্থ শ্রেণি (২০তম–১৭তম গ্রেড): ১ লাখ ১৫ হাজার ২৩৫টি
অন্যান্য (চুক্তিভিত্তিক ও নির্ধারিত বেতনভুক্ত): ৮ হাজার ১৩৬টি
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এত বিপুল শূন্য পদ দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি করছে এবং সেবা প্রদানের গতি কমিয়ে দিচ্ছে।
বিচার বিভাগে জনবল সংকট
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জানান, বর্তমানে দেশে বিচারকের অনুমোদিত পদ ২ হাজার ৬২০টি হলেও কর্মরত রয়েছেন ১ হাজার ৯৬৪ জন। ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদ শূন্য রয়েছে।
তিনি বলেন, শূন্য পদ পূরণে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন আদালত স্থাপনের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।
আইনমন্ত্রী আরও জানান, সরকার সম্প্রতি ৬৫০টি সিভিল জজ ও সিনিয়র জজ আদালত, ৪০৬টি যুগ্ম দায়রা জজ আদালত এবং ২০৪টি অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত প্রতিষ্ঠা করেছে। এসব নতুন আদালতের জন্য অতিরিক্ত বিচারক পদ সৃষ্টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।
পারিবারিক আদালতে মামলার চাপ
আইনমন্ত্রী জানান, চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশে পারিবারিক আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৩০টি।
পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তি দ্রুত করতে সারাদেশে ১৬৩টি পারিবারিক আদালত এবং ৬৫টি পারিবারিক আপিল আদালত কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলেও তিনি জানান।
রাজনৈতিক মামলার পরিসংখ্যান ও অভিযোগ
সংসদে প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, মামলার এজাহারে সাধারণত রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ না থাকায় সুনির্দিষ্টভাবে কতগুলো মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা নির্ধারণ করা কঠিন।
তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তিনি জানান, ২০০৭ থেকে ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিএনপির নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে মোট ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৩টি মামলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক কারণে দায়ের হওয়া ২৩ হাজার ৮৬৫টি হয়রানিমূলক মামলা ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বাকি মামলাগুলো পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা করে প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
প্রশাসনিক সক্ষমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল সংখ্যক শূন্য পদ, বিচার বিভাগে জনবল ঘাটতি এবং মামলা জট প্রশাসনিক ও বিচার ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে। সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োগ ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিলেও তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয় বলে মনে করা হচ্ছে।
তাঁরা বলছেন, দ্রুত নিয়োগ, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং বিচারিক সংস্কার কার্যকর করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে সেবাদান ব্যবস্থায় ধীরগতি অব্যাহত থাকতে পারে।