
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার একটি সড়কের নাম পরিবর্তন ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মধ্য কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকার সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউয়ের নাম বদলে কলকাতা পুরসভা নতুন নাম দিয়েছে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছে।
পুরসভার সিদ্ধান্তে নতুন নামকরণ
কলকাতা পুরসভা সম্প্রতি এক ঘোষণায় জানায়, পার্ক সার্কাস এলাকার ওই সড়কের নাম পরিবর্তন করে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’ রাখা হয়েছে। গোপাল মুখার্জি, যিনি ‘গোপাল পাঁঠা’ নামে বেশি পরিচিত ছিলেন, ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা রক্ষায় ভূমিকা রাখেন বলে দাবি করা হয়।
ভারতের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই গোপাল মুখার্জিকে ঘিরে একটি বিশেষ রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করার চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে বিজেপি নেতৃত্ব গত এক দশকে তাকে ইতিহাসে আরও বেশি করে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় এই নাম পরিবর্তনকে দেখা হচ্ছে।
‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
নাম পরিবর্তনের সময়টি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কারণ, এই পরিবর্তন এসেছে পশ্চিমবঙ্গ দিবসকে ঘিরে রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যে।
‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ মূলত ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গভাগের পক্ষে বঙ্গীয় আইনসভার হিন্দু সদস্যদের ভোটাভুটির স্মরণে পালিত হয়। ওই ভোটের মাধ্যমে অবিভক্ত বাংলাকে ভাগ করে ভারতের অংশ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
বিজেপি এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’কে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে এই ব্যাখ্যা ও ইতিহাস নিয়েও রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে।
শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্যে নতুন উত্তেজনা
বিতর্ক আরও তীব্র হয় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টকে কেন্দ্র করে। তিনি কলকাতা পুরসভার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে একে ‘ঐতিহাসিক সংশোধন’ হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি দাবি করেন, যে সড়কের নাম আগে ছিল তা এমন একজন ব্যক্তির নামে ছিল যিনি রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সহিংসতা ও গণহত্যার জন্য দায়ী ছিলেন। তার বিপরীতে গোপাল মুখার্জি ছিলেন ‘রক্ষক ও ত্রাণকর্তা’।
শুভেন্দু অধিকারী পরোক্ষভাবে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রসঙ্গ টেনে আনেন, যিনি অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। ভারতে অনেক রাজনৈতিক মহলে তাকে বিতর্কিত চরিত্র হিসেবে দেখা হয়, বিশেষ করে ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা প্রসঙ্গে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু: রাস্তার নাম আসলে কার?
তবে মূল বিতর্ক এখানে আরও জটিল রূপ নেয়। তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুনাল ঘোষ দাবি করেন, রাস্তার নাম আসলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে ছিল না।
তার মতে, এটি ছিল স্যার ড. হাসান সোহরাওয়ার্দীর নামে—যিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং প্রশাসনিক ব্যক্তিত্ব। তিনি দাবি করেন, তথ্য বিভ্রান্তির কারণে একজন ভিন্ন ব্যক্তির নামকে বিতর্কের কেন্দ্রে আনা হয়েছে।
কুনাল ঘোষ বলেন, “ইতিহাস যাচাই না করে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে।”
কংগ্রেসের পাল্টা অবস্থান
কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশও একই ধরনের দাবি তুলে বলেন, রাস্তার নামকরণ হয়েছিল স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীর নামে। তিনি আরও যোগ করেন, সেই সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যাদের মধ্যে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ও রয়েছেন।
তার মতে, বিষয়টি শুধুমাত্র রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক নয়, বরং ঐতিহাসিক নথি যাচাই করা জরুরি।
ইতিহাসবিদদের নতুন ব্যাখ্যা
বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয় যখন নাগরিক সমাজের একাংশ ও গবেষকরা ভিন্ন মত প্রকাশ করেন। কলকাতার এক সাংবাদিক সুমিত চৌধুরী সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেন, ১৯৩৩ সালে যখন রাস্তার নামকরণ হয়, তখন দুই সোহরাওয়ার্দী—হাসান ও হোসেন—দুজনই জীবিত ছিলেন।
তার যুক্তি অনুযায়ী, কলকাতা পুরসভার নীতিমালায় জীবিত ব্যক্তির নামে রাস্তার নামকরণ সাধারণত করা হয় না। ফলে নামটি অন্য কোনো ব্যক্তির প্রতি ইঙ্গিত করতে পারে।
তিনি আরও দাবি করেন, নথি অনুযায়ী ওই নামটি সম্ভবত মৌলানা আবদুল্লাহ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সম্পর্কিত, যিনি একজন ধর্মীয় পণ্ডিত ও আইনজীবী ছিলেন এবং কলকাতায় যথেষ্ট সম্মানিত ছিলেন।
বিভ্রান্তির কেন্দ্রবিন্দুতে ইতিহাস
তবে এই দাবিও পুরো বিতর্ক শেষ করতে পারেনি। কারণ, বিভিন্ন সময়ের নথি, রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও পারিবারিক পরিচয় একে অপরের সঙ্গে মিলে না যাওয়ায় স্পষ্ট ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একই পরিবারের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব থাকায় ‘সোহরাওয়ার্দী’ নামটি ঘিরে বিভ্রান্তি দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান।
রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক টানাপোড়েন
বর্তমান বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু শুধু একটি রাস্তার নাম নয়, বরং ইতিহাসের ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক পরিচয়ের লড়াই। একদিকে বিজেপি ও তার সমর্থকরা গোপাল মুখার্জিকে তুলে ধরতে চাইছে, অন্যদিকে বিরোধীরা বলছে ঐতিহাসিক তথ্য যাচাই ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে কংগ্রেস ও তৃণমূল উভয়েই দাবি করছে, নাম পরিবর্তনের আগে যথাযথ তথ্য যাচাই হয়নি।
সব মিলিয়ে কলকাতার একটি সড়কের নাম পরিবর্তন এখন কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি রূপ নিয়েছে ইতিহাস, রাজনীতি ও পরিচয়ের জটিল বিতর্কে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি এখন আর শুধু ‘সড়কের নাম কী ছিল’—এখান থেকে সরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে আরও বড় জায়গায়: ইতিহাসের কোন ব্যাখ্যাকে সত্য ধরা হবে, আর কোন ব্যাখ্যা রাজনৈতিক প্রভাবের অংশ হিসেবে দেখা হবে।
ফলে এই বিতর্ক আপাতত শেষ হওয়ার নয়; বরং এটি ইতিহাসবিদদের গবেষণা ও রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যেই আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলবে।