
শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা নিরসনে আগামী ২ জুলাইয়ের আপিল বিভাগের রায়ের দিকে তাকিয়ে আছে শিক্ষা খাত। ওই দিন কাঙ্ক্ষিত রায় এলে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে খালি থাকা শিক্ষক পদ পূরণের পথ উন্মুক্ত হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
মঙ্গলবার (২৪ জুন) চট্টগ্রাম কলেজ মিলনায়তনে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রাম অঞ্চলের মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা, পরীক্ষাকেন্দ্রের সচিব এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার মামলার জটিলতার কারণে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে ২০১৭ সালের একটি আইনি জটিলতার কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩২ হাজার ৫০০ জনকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আগামী ২ জুলাই ২০২৬ আপিল বিভাগে এই মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য রয়েছে। আমরা আশা করছি, ওই দিন একটি কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে এবং এর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের জটিলতা দূর হবে।’
শিক্ষা খাতে প্রয়োজন আরও ৭৭ হাজার শিক্ষক
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে জমে থাকা বড় ধরনের ব্যাকলগ রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান করতে দেশে বর্তমানে আরও প্রায় ৭৭ হাজার নতুন শিক্ষক প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শিক্ষার মান উন্নয়নে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট দূর করতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
শিক্ষা ব্যবস্থায় অসহযোগিতার অভিযোগ
শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, শিক্ষা খাতে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে সবাইকে সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি অভিযোগ করেন, শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন জায়গায় একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের গুপ্ত অনুসারীরা রয়েছে, যারা সরকারের শিক্ষা উন্নয়ন কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে চাইছে না।
জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের মানুষ পরিবর্তনের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছে। প্রশাসনে কোনো ধরনের দুর্বলতা গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও তিনি সতর্ক করেন।
ডিজিটাল নকল ঠেকাতে সিসিটিভির ওপর গুরুত্ব
পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, নকলের ধরন এখন পরিবর্তিত হয়েছে। প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে প্রযুক্তি ব্যবহার করে অসদুপায় অবলম্বনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘২০০৬ সালে আমরা নকল শব্দটির কবর দিয়ে এসেছি। এটা নিয়ে আর কথা বলতে চাই না। এখন নকল ডিজিটাল রূপ নিয়েছে। সেটাকে সেভাবেই প্রতিহত করতে হবে।’
এ জন্য প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকা বাধ্যতামূলক হওয়া প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি। এর মাধ্যমে পরীক্ষাকেন্দ্রে ডিজিটাল নজরদারি বা ভিজিল্যান্স নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
প্রশ্নফাঁস রোধে কঠোর অবস্থানের কথা জানালেন মন্ত্রী
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, গত কয়েক বছরে প্রশ্নফাঁস দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই চক্র ভাঙতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একযোগে কাজ করছে।
তিনি বলেন, প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে তিনি নিজে বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট প্রেস (বিজি প্রেস) পরিদর্শন করেছেন এবং প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজরদারি করেছেন।
শিক্ষামন্ত্রীর ভাষ্য, পরীক্ষার শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। শিক্ষার্থীদের পরিশ্রমের মূল্যায়নে কোনো ধরনের অনিয়ম যেন প্রভাব ফেলতে না পারে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এসএসসির খাতা পুনঃনিরীক্ষণের উদ্যোগ
আসন্ন এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী জানান, আগামী ২০ জুলাই ফল প্রকাশ করা হবে।
তিনি বলেন, ফল প্রকাশের আগে ও পরে পরীক্ষার খাতা র্যান্ডমভাবে যাচাই করা হবে। কোনো পরীক্ষার্থীকে কম বা বেশি নম্বর দেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
তিনি বলেন, ‘এসএসসির খাতা র্যান্ডমলি চেক করব, কেউ কম বা বেশি নম্বর দিয়ে দিলেন কি না।’
শিক্ষায় বড় বাজেট, অর্থের সঠিক ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি
শিক্ষা খাতের বাজেট প্রসঙ্গে আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, বর্তমান সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার একটি বাস্তবসম্মত বাজেট দিয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, এর আগে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আইসিটি মন্ত্রণালয়ের বাজেটকে শিক্ষা খাতের সঙ্গে যুক্ত করে প্রকৃত চিত্র আড়াল করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, বরাদ্দ করা অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে এবং শিক্ষা খাতের উন্নয়নে তা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যারা
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন।
সভায় এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা-২০২৬ সুষ্ঠু, নকলমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে আয়োজনের প্রস্তুতি এবং পরীক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।