
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সবচেয়ে বড় চাওয়া সন্তানের হত্যার দৃশ্যমান বিচার বলে উল্লেখ করেছেন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম। আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই দাবি জানান।
বক্তব্যের শুরুতেই নিজের সন্তান জাবির ইব্রাহিমের স্মৃতিচারণা করে রোকেয়া বেগম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “৫ আগস্ট আমার ছোট্ট জাবির ইব্রাহিম গুলিবিদ্ধ হয় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শাহাদাত বরণ করে। পুরো রক্ত এই জমিনে পড়ে গিয়েছিল, একটা ফোঁটাও ওর ভেতরে ছিল না। আমার ছেলের মতো অসংখ্য শহীদের রক্ত ও বীর সন্তানের অঙ্গহানির আর্তনাদে ভাসছে এই জাতীয় সংসদ।”
ধীরগতির বিচার প্রক্রিয়া ও পলাতক আসামি নিয়ে উদ্বেগ
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে রোকেয়া বেগম বলেন, “একজন বাবা বা মা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার আগে যেটা চায়, সেটা হলো তার সন্তানের হত্যার বিচার। দৃশ্যমান বিচার ছাড়া কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলুপ্তি সম্ভব নয়।”
তিনি বিচার প্রক্রিয়ার সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন:
২১ জুন আইনমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ৮০টি মামলা হয়েছে।
গত প্রায় দুই বছরে মাত্র ৭টি মামলার রায় হয়েছে এবং ২২টির সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে।
এই মামলাগুলোতে মোট আসামি ৪৬৩ জন। এর মধ্যে ১৭৪ জন গ্রেপ্তার হলেও ২৮৮ জন এখনো পলাতক।
পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে কী অগ্রগতি হয়েছে, সেই প্রশ্ন তুলে প্রতি অধিবেশনে বিচারিক কার্যক্রমের হালনাগাদ তথ্য সংসদে উপস্থাপনের জন্য স্পিকারের মাধ্যমে আইনমন্ত্রীর কাছে দাবি জানান তিনি।
শহীদ ও আহতদের গেজেট এবং শ্রেণিবিন্যাসে অসঙ্গতি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের সঠিক স্বীকৃতি ও আহতের শ্রেণিবিন্যাস নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই সংসদ সদস্য। তিনি জানান, বর্তমানে ৮৩৪ জন শহীদ এবং ১৪ হাজার ৪০৭ জন আহত যোদ্ধা স্বীকৃত। তবে এটি কেবল কোনো পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি বিপর্যস্ত পরিবার।
তিনি দুটি প্রধান অসঙ্গতি তুলে ধরেন:
১. তালিকাভুক্তি: জুলাই বিপ্লবে শহীদের সংখ্যা হাজারের বেশি হলেও এখন পর্যন্ত গেজেটভুক্ত করা হয়েছে মাত্র ৮৩৪ জনকে। এখনো প্রায় ৫০ জন শহীদের নাম তালিকাভুক্ত হয়নি।
২. শ্রেণিবিন্যাস: আহত যোদ্ধাদের ক্যাটাগরি নির্ধারণে ত্রুটি রয়েছে। আন্দোলনে যার হাত চলে গেছে, সে কীভাবে ‘গ’ ক্যাটাগরিতে থাকে—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের জন্য ৩টি দাবি
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন এ পর্যন্ত ৮৩১টি শহীদ পরিবার ও ৬২৭ জন আহত যোদ্ধাকে ১২০ কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অডিটে এর স্বচ্ছতা প্রমাণিত হয়েছে। তবে তিন মাস ধরে ফাউন্ডেশনের কর্মীরা বেতন ও ঈদ বোনাস পাননি উল্লেখ করে রোকেয়া বেগম সংসদে তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি জানান:
পৃথক আর্থিক কোড: ফাউন্ডেশনের জন্য পৃথক আর্থিক কোডের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা।
বকেয়া অর্থ ছাড়: শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের জন্য সরকারের প্রতিশ্রুত অবশিষ্ট ২৬৩ কোটি টাকা দ্রুত বরাদ্দ দেওয়া।
আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় অথবা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফাউন্ডেশনটিকে আনুষ্ঠানিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।
‘আইনি সুরক্ষাই রাজনৈতিক সুরক্ষা’: আইনমন্ত্রী
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বাস্তব জীবনে জুলাই যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে হুমকি, নির্যাতন এবং স্মৃতিস্তম্ভে হামলার অভিযোগ তুলে তাদের জন্য রাজনৈতিক সুরক্ষার দাবি জানান রোকেয়া বেগম। তিনি বলেন, “জুলাইকে মুছে ফেলতে পলাতক ফ্যাসিস্টের বাহিনী বাস্তবে ও সামাজিক মাধ্যমে অতিমাত্রায় তৎপর।”
তার এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি শহীদ মাতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, “যিনি শহীদ মাতা বক্তৃতা দিয়েছেন, তাঁর প্রতিটি বক্তব্যই আমাদের চেতনায়, আমাদের রক্তে, আমাদের বিপ্লবে, আমাদের সংগ্রামের প্রেরণার মূল চেতনা।”
জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষার বিষয়ে আইনমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন:
“প্রতিটি আইন একটি রাজনৈতিক দলিল এবং সরকারের একটি পাবলিক পলিসি। সরকারের পক্ষ থেকে যে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব, সেটা আইনি কাঠামোর মধ্যেই সম্ভব। আমাদের সরকার, জুলাই যোদ্ধাদের সরকার, জুলাই চেতনার সরকার সেই আইনি কাঠামোর মধ্যেই জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা দিয়েছে এবং সেটাই রাজনৈতিক সুরক্ষা হিসেবে বিবেচিত হবে। এর বাইরেও যদি কোনো রাজনৈতিক সুরক্ষার প্রয়োজন হয়, তিনি যদি সুনির্দিষ্টভাবে বলেন, আমরা আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে সেই সুরক্ষা দিতে প্রস্তুত আছি।”