
আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত গুম, খুন ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে সরকারকে কঠোর বার্তা দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে সরকারকে ক্ষমতায় থাকার পথ খুঁজে নিতে হবে।
মঙ্গলবার (২৪ জুন) বিকেলে রাজধানীর বিজয়নগরে আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি এ মন্তব্য করেন। ‘আওয়ামী ফ্যাসিস্টের সংঘটিত সকল গুম, খুন ও গণহত্যার বিচারের দাবিতে’ ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য এ সমাবেশের আয়োজন করে।
সমাবেশে শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্ত হওয়ার কথা বললেও এখন সেই ফ্যাসিবাদের পথেই হাঁটছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, এভাবে চললে দেশ আবার একদলীয় শাসনের দিকে এগিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ কিন্তু বারবার বিপ্লবের সাক্ষী। আমরা পরিষ্কার বলে দিচ্ছি, হয় আপনারা বিচার নিশ্চিত করুন, না হয় আপনারা যাওয়ার রাস্তা খুঁজে বের করুন।’
জামায়াতের আমির অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ফ্যাসিবাদী আমলের গুম, খুন ও নির্যাতনের বিচার করার কথা বলেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তাদের অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে।
তিনি বলেন, এখন তারা বিচার করছে না। বরং গত চার মাসে ছয় শতাধিক মানুষ নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেও নিজ দলের কর্মীদের হত্যার অভিযোগ তোলেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, যাদের নিজেদের কর্মীদের প্রতি দায়বদ্ধতা ও দরদ নেই, তাদের কাছ থেকে ২০ কোটি মানুষের জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা আশা করা কঠিন।
বিএনপি নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা আপনাদের বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করব, মজলুম ছিলেন, জালেম হবেন না। মেহেরবানি করে বিচারগুলো নিশ্চিত করুন।’
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক প্রয়াত শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার বিচার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াত আমির।
তিনি অভিযোগ করেন, এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে এবং এখনো চার্জশিট দেওয়া হয়নি।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘কাকে খুশি করার জন্য, কোন সত্যকে আড়াল করার জন্য এটা করা হচ্ছে, জনগণ জানতে চায়।’
সম্প্রতি গাইবান্ধায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা সাইফুল্লাহ বারী হত্যার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, হত্যার মাধ্যমে মানুষকে পৃথিবী থেকে সরানো সম্ভব হলেও কোনো আদর্শকে হত্যা করা যায় না।
বিএনপির প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতের আদর্শ নির্মূলের চিন্তা থেকে দূরে থাকতে হবে।
তিনি বলেন, বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা আদর্শ নির্মূলের কথা বলেছেন। কিন্তু এ ধরনের চিন্তা এক ধরনের ‘ভাইরাস’ হিসেবে কাজ করে।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও দলীয় শাসনের মতো সমস্যাগুলো দূর করতে আরেকটি পরিবর্তন প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।
সমাবেশে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানান জামায়াত আমির।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের দিকে কাউকে লাল চোখ দিয়ে তাকাতে দেওয়া হবে না। কোনো কালো হাত বাড়ালে সেই হাত গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত দেশকে পাহারা দেবে এবং কারও পক্ষেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সুযোগ নেই।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ, বিভিন্ন ব্যাংকে হস্তক্ষেপ, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে দলীয় অনুগতদের প্রাধান্য দেওয়া এবং প্রশাসনে দলীয় লোক বসানোর মতো কর্মকাণ্ড দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, এমনকি খেলার মাঠও দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা হয়নি।
সংসদে থাকা প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, যত দিন পর্যন্ত সংসদে জনগণের স্বার্থে কথা বলার পরিবেশ থাকবে, তত দিন তাঁরা দায়িত্ব পালন করবেন।
তিনি বলেন, সংসদের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে বলে মনে হলে সেদিনই তাঁরা সংসদ থেকে বেরিয়ে আসবেন।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমাদ আলী কাসেমী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমির আবদুল মাজেদ আতহারী।
এ ছাড়া আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিনসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ১১–দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।
সঞ্চালনা করেন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ এবং মহানগর উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ফখরুদ্দিন মানিকসহ অন্যরা।
সমাবেশে বক্তারা গুম, খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোর বিচার, রাজনৈতিক সংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার দাবি জানান।