
পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে জোরপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসা মানবাধিকারকর্মী মাহরাং বেলুচকে আধাসামরিক বাহিনীর এক সদস্য হত্যার মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ২০২৪ সালের একটি সমাবেশে ওই সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাঁকে ও তাঁর সহকর্মী সিবগাতুল্লাহকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
তবে এই রায় নিয়ে পাকিস্তান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ভিন্নমত প্রকাশ ও রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে দেখার প্রবণতা এই বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটার সন্ত্রাসবিরোধী আদালত মাহরাং বেলুচ ও সিবগাতুল্লাহকে হত্যা ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন।
সমাবেশে হামলার অভিযোগ
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বেলুচিস্তানের উপকূলীয় শহর গোয়াদরে একটি সমাবেশ চলাকালে আধাসামরিক বাহিনী ফেডারেল কনস্ট্যাবুলারির সদস্য শাব্বির আহমেদের ওপর হামলা হয়।
নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ওই সমাবেশে মাহরাং বেলুচ ‘উসকানিমূলক বক্তব্য’ দিয়েছিলেন। এরপর ৩০ থেকে ৪০ জন মানুষ লাঠিসোঁটা ও পাথর নিয়ে একটি গাড়িতে হামলা চালায়।
নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি, হামলার সময় শাব্বির আহমেদ অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
তবে মাহরাং বেলুচ ও তাঁর সহকর্মী এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তাঁদের আন্দোলনকে দমন করার জন্য এই বিচার করা হয়েছে।
আদালতের রায় ও সাজা
কোয়েটার সন্ত্রাসবিরোধী আদালত রায়ে বলেছে, মাহরাং বেলুচ ও সিবগাতুল্লাহ ‘বেলুচ ইউনিটি কমিটির অবৈধ সমাবেশে সক্রিয় ছিলেন’ এবং ফেডারেল কনস্ট্যাবুলারির সদস্য হত্যার ঘটনায় তাঁদের ‘অভিন্ন উদ্দেশ্য’ ছিল।
আদালত দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি নিহত শাব্বির আহমেদের পরিবারের জন্য ২ লাখ পাকিস্তানি রুপি জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন অভিযোগে মাহরাং বেলুচ ও সিবগাতুল্লাহ প্রায় দুই বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন।
বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনের উদ্বেগ
পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশন (এইচআরসিপি) এই রায় পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে।
সংস্থাটি বলেছে, রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মৌলিক অধিকারের পক্ষে কথা বলাকে চরমপন্থার সঙ্গে এক করে দেখার প্রবণতা বজায় রেখেছে। এর ফলে প্রশাসনিক ও বিচারিক সিদ্ধান্তগুলো একপেশে হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মাহরাং বেলুচের বোন ও আইনজীবী নাদিয়া বেলুচ এবং তাঁর আইনি দল জানিয়েছেন, তাঁরা এই রায় প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তাঁদের অভিযোগ, আসামিপক্ষ ন্যায়বিচারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আইনজীবীরা দাবি করেন, একটি গোপন ও অজ্ঞাত আদালতে বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে এবং ভিডিও লিংকের মাধ্যমে সাক্ষ্য দেওয়া প্রত্যক্ষদর্শীদের যথাযথভাবে জেরা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
গ্রেটা থুনবার্গের সমালোচনা
সুইডিশ পরিবেশ ও মানবাধিকারকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও এই বিচারপ্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন।
এক বিবৃতিতে তিনি বিচারটিকে ‘বিচারের নামে প্রহসন’ এবং ‘সম্পূর্ণ গোপনে’ পরিচালিত বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার জন্য পাকিস্তান সরকারের সমালোচনা করেন তিনি।
তবে বেলুচিস্তান প্রাদেশিক সরকারের এক মুখপাত্র বার্তা সংস্থা এপিকে বলেছেন, প্রসিকিউটরদের কাছে মামলার পক্ষে ‘অকাট্য প্রমাণ’ রয়েছে। তাঁর দাবি, মামলাটি কোনোভাবেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়।
কে এই মাহরাং বেলুচ?
মাহরাং বেলুচ বেলুচিস্তানের অন্যতম পরিচিত মানবাধিকারকর্মী। ২০২৪ সালে বিবিসির প্রকাশিত বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী নারীর তালিকায় তাঁর নাম স্থান পেয়েছিল।
তাঁর মানবাধিকার আন্দোলনের শুরু হয় ২০০৯ সালে, যখন তাঁর বাবা নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের হাতে তুলে নেওয়ার পর নিখোঁজ হন। দুই বছর পর তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়। পরিবারের দাবি, তাঁর শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন ছিল।
এরপর থেকেই মাহরাং বেলুচ জোরপূর্বক গুমের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যুক্ত হন।
ইসলামাবাদ পর্যন্ত দীর্ঘ পদযাত্রা
২০২৩ সালের শেষ দিকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের বিচারের দাবিতে শত শত নারীকে সঙ্গে নিয়ে ইসলামাবাদ অভিমুখে দীর্ঘ পদযাত্রার নেতৃত্ব দেন মাহরাং বেলুচ।
প্রায় ১ হাজার মাইল বা ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ওই পদযাত্রা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
তাঁর নেতৃত্বাধীন বেলুচ ইউনিটি কমিটি (বিওয়াইসি) বেলুচিস্তানে জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছে।
বেলুচিস্তানের দীর্ঘদিনের সংকট
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশ বেলুচিস্তানে কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক অধিকার, স্বায়ত্তশাসন ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উত্তেজনা রয়েছে।
এই অঞ্চলে বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতাও রয়েছে। তবে বিওয়াইসি জানিয়েছে, তাদের সঙ্গে বেলুচ বিদ্রোহীদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে অধিকার আদায়ের চেষ্টা করছে।
মাহরাং বেলুচের সাজা বেলুচিস্তানের মানবাধিকার পরিস্থিতি, রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের সম্পর্ক এবং ভিন্নমতের প্রতি সরকারের অবস্থান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।