
প্রাথমিক শিক্ষায় সাংস্কৃতিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ কোনো বিতর্কের বিষয় নয়, বরং এটি শিশুদের সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, আত্মপ্রকাশ ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
তিনি বলেছেন, সংগীত, সাহিত্য, আবৃত্তি, নাটক, চিত্রকলা কিংবা কিরাত—প্রতিটি ক্ষেত্রই শিশুদের নিজস্ব প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ তৈরি করে। কোনো শিক্ষার্থী কোন মাধ্যমে নিজের বিকাশ ঘটাবে, তা তার ও তার পরিবারের পছন্দের বিষয়।
বৃহস্পতিবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ আয়োজিত রবীন্দ্র-নজরুল উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নতুন শিক্ষাক্রমে সাংস্কৃতিক শিক্ষার গুরুত্ব
ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার নতুন শিক্ষাক্রমে সাংস্কৃতিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আবৃত্তি, কিরাত, বক্তৃতা, সংগীত, নৃত্য, নাটকসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।
তিনি বলেন, শিশুদের শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের চিন্তা, কল্পনাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও মানবিক গুণাবলি বিকাশে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সাংস্কৃতিক শিক্ষাকে ঘিরে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি না করে শিশুদের সামগ্রিক বিকাশের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তিনি এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে কাজ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান।
সৃজনশীল বিষয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতায় সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ
অনুষ্ঠানে ববি হাজ্জাজ জানান, সংগীত, চারুকলা, নাট্যকলা ও অন্যান্য সৃজনশীল বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ সম্প্রসারণে কাজ করছে সরকার।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা বাড়াতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রয়োজন। সংগীত, নাটক ও চারুকলার শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়ে শিশুদের সৃজনশীল বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।
রবীন্দ্র-নজরুলের অবদান স্মরণ
রবীন্দ্র-নজরুল উৎসবে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বলেন, বাঙালির চিন্তা, মনন ও সাংস্কৃতিক বিকাশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম-এর অবদান অনস্বীকার্য।
তিনি বলেন, দুই কবি তাঁদের সাহিত্য, সংগীত ও চিন্তাধারার মাধ্যমে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁদের সৃষ্টি এখনো মানুষের জীবন ও চিন্তায় অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সাবিনা শরমীন বলেন, বাংলা সাহিত্যের দুই মহান কবিকে ঘিরে আয়োজিত এ উৎসব প্রশংসনীয়।
তিনি বলেন, নজরুল ছিলেন সাম্যবাদী, মানবতাবাদী ও সময়সচেতন কবি। তাঁর সাহিত্য ও দর্শন বর্তমান সমাজেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
তরুণদের নিজস্ব জাতিসত্তা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির শিকড় অনুসন্ধানের আহ্বান জানান তিনি।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর উৎসব
আলোচনা পর্ব শেষে আয়োজিত হয় বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আলী এফ এম রেজোয়ান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সহকারী অধ্যাপক মো. মাহমুদুর রহমান।
অনুষ্ঠানে দেশের প্রখ্যাত নজরুলসংগীতশিল্পী ফেরদৌস আরা, ইয়াকুব আলী খান, ইয়াসমীন মুশতারী ও টিটু মুন্সি সংগীত পরিবেশন করেন।
এ ছাড়া জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে।
শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির নৃত্যকলা বিভাগের শিল্পীরা কাজী নজরুল ইসলামের ‘লেটো পালা’ পরিবেশন করেন। পাশাপাশি ধৃতি নর্তনালয় এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনাও অনুষ্ঠানে বিশেষ মাত্রা যোগ করে।
দুই দিনব্যাপী উৎসবের সমাপ্তি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য, সংগীত ও মানবিক দর্শনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে দুই দিনব্যাপী রবীন্দ্র-নজরুল উৎসবের সমাপনী আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান অণিমা রায়।
আয়োজকেরা বলেন, এ ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশের পাশাপাশি দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের যোগাযোগ আরও দৃঢ় করতে ভূমিকা রাখবে।