
ভয়াবহ তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত ইউরোপ। শুক্রবার মহাদেশটির অন্তত ১৫ কোটি মানুষ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার মুখোমুখি হয়েছেন। প্রচণ্ড গরমে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে জার্মানি ও ফ্রান্স। এর মধ্যে শুধু জার্মানিতেই পাঁচ কোটির বেশি এবং ফ্রান্সে তিন কোটির বেশি মানুষ তীব্র তাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
আবহাওয়াবিদদের হিসাবে, তুরস্ক বাদ দিয়ে ইউরোপের প্রায় ৪২ কোটি মানুষ ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার মুখে পড়তে পারেন। এটি ইউরোপের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশ।
জার্মান আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাস এবং ২০২৫ সালের জনসংখ্যার হিসাবের ভিত্তিতে এই বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অস্ট্রিয়ার বেসরকারি সংস্থা ক্লাইমাড্যাশবোর্ডের হিসাবেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ঘন ঘন ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অন্যতম বড় লক্ষণ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে এমন তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন, দীর্ঘ সময় ধরে এবং আরও তীব্র আকারে দেখা দিতে পারে।
জার্মানিতে ‘চরম তাপ সতর্কতা’
তাপপ্রবাহের কারণে জার্মানির আবহাওয়া বিভাগ দেশজুড়ে সতর্কতা জারি করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, শুক্রবার ও সপ্তাহান্তে দেশের প্রায় সব অঞ্চলে তীব্র গরম অব্যাহত থাকবে।
বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম, পশ্চিম, মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের অনেক এলাকায় ‘চরম তাপপ্রবাহ’ দেখা দিতে পারে।
জনগণকে সতর্ক করতে প্রকাশ করা আবহাওয়া মানচিত্রের বড় অংশ গাঢ় বেগুনি রঙে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা সর্বোচ্চ পর্যায়ের তাপ সতর্কতার নির্দেশক।
জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিরলাখ শহরে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। এটি জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ডের কাছাকাছি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সপ্তাহান্তে দেশটিতে নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড তৈরি হতে পারে।
ফ্রান্সে বন্ধ স্কুল, চাপে হাসপাতাল
ফ্রান্সে তাপপ্রবাহের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে।
প্রচণ্ড গরমের কারণে দেশটির হাজারো স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রয়েছে, সেখানেও পাঠদান ও পরীক্ষা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্কুল, শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র ও নার্সারিতে শীতলীকরণ ব্যবস্থা স্থাপনের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ কোম্পানি ইডিএফ আট কোটি ইউরো বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে।
এ ছাড়া বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে শীতলীকরণ ব্যবস্থা উন্নত করতে সরকার অতিরিক্ত পাঁচ কোটি ইউরো বরাদ্দ দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
তাপপ্রবাহজনিত অসুস্থতায় রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় প্যারিসের হাসপাতালগুলোতে চাপ তৈরি হয়েছে।
প্যারিসের পুলিশপ্রধান পাত্রিস ফোর বলেন, ‘আমরা হাসপাতালের সক্ষমতার সীমায় পৌঁছে গেছি। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।’
গরম থেকে বাঁচতে পানিতে নেমে মৃত্যু
প্রচণ্ড গরম থেকে স্বস্তি পেতে অনেক মানুষ নদী, হ্রদ ও বিভিন্ন জলাশয়ে নামছেন। তবে এতে দুর্ঘটনাও বাড়ছে।
ফ্রান্সে পানিতে ডুবে মৃতের সংখ্যা অন্তত ৫৫ জনে পৌঁছেছে। দেশটির ক্রীড়ামন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
হাসপাতালের ওপর চাপ কমাতে শুক্রবার থেকে প্যারিসে প্রকাশ্যে মদপান ও মদ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে কর্তৃপক্ষ।
তীব্র গরমের কারণে সপ্তাহান্তে প্যারিসে অনুষ্ঠেয় প্রাইড প্যারেড বাতিল করেছে আয়োজকেরা। এর আগে পুলিশ জানিয়েছিল, তাপপ্রবাহের কারণে অনুষ্ঠান বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যে জুনের তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙল
যুক্তরাজ্যেও ভয়াবহ গরমের প্রভাব পড়েছে।
বৃহস্পতিবার দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যা জুন মাসের আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলমান এই তাপপ্রবাহের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে।
নেদারল্যান্ডসে প্রথমবার সর্বোচ্চ সতর্কতা
তাপপ্রবাহের কারণে নেদারল্যান্ডস ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সর্বোচ্চ পর্যায়ের সতর্কতা জারি করেছে।
দেশটির কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় আবহাওয়া ইনস্টিটিউট জনগণকে সতর্ক করে জানিয়েছে, পরিস্থিতি বিপজ্জনক হতে পারে। জরুরি সেবা সংস্থা ও সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া স্লোভাকিয়াও শনিবারের জন্য সর্বোচ্চ মাত্রার তাপ সতর্কতা জারি করেছে। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন সতর্ক সংকেত
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে ঘন ঘন তাপপ্রবাহ এখন নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠছে। অতীতের তুলনায় তাপপ্রবাহের সময়কাল দীর্ঘ হচ্ছে এবং এর প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবহন ও অর্থনীতির ওপর।
বয়স্ক মানুষ, শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
চলমান তাপপ্রবাহ ইউরোপের দেশগুলোর জন্য শুধু তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, বরং ভবিষ্যতের জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাও আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।