
শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করতে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত তৃতীয় ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, শিক্ষার্থীরা একাধিক ভাষায় দক্ষতা অর্জন করলে দেশ-বিদেশের যেকোনো পরিবেশে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে এবং বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
সোমবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং’ জাতীয় প্রদর্শনী এবং সারা দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের ভবিষ্যৎকে আমরা সাজাব। সে জন্যই সিদ্ধান্ত নিয়েছি—ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত তৃতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজিসহ আরও কিছু ভাষা আমরা নির্বাচন করব। যে ভাষা শিখলে দেশে বা বিদেশের যেকোনো জায়গায় গেলে যেন কোনো সমস্যায় পড়তে না হয়।”
তিনি বলেন, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। এ লক্ষ্যেই শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন নতুন বিষয় যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষায় খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও কারিগরি দক্ষতার সংযোজন
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের জন্য শুধু পাঠ্যবইনির্ভর শিক্ষা যথেষ্ট নয়। তাই শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে খেলাধুলা, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমরা সিলেবাসের মধ্যে বিভিন্ন খেলা অন্তর্ভুক্ত করব। এতে যার যে খেলা ভালো লাগবে, সে খেলায় আরও বেশি দক্ষ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই আমরা কারিগরি শিক্ষা চালু করতে চাই। এটি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বাড়তি দক্ষতা হিসেবে যোগ হবে।”
তারেক রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে থাকা সম্ভাবনা খুঁজে বের করে তা বিকশিত করাই সরকারের লক্ষ্য। ভবিষ্যতে দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য এখন থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “আমাদের সব আয়োজন তোমাদের ঘিরে। কারণ, আমরা এখন আছি, পরে থাকব না। কিন্তু তোমরা থাকবে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নেতৃত্ব তোমরা দেবে।”
ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গঠনে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের প্রতিটি উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা, যারা ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারবে।
তিনি বলেন, “আমাদের প্রতিটি কাজের আউটপুট থাকতে হবে, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে অন্য সব দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিয়ে যাবে।”
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, দেশের উন্নয়ন শুধু নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্রের ওপর নির্ভর করে না। খেলাধুলা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও উদ্ভাবন—সব ক্ষেত্রেই দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম দেশকে এগিয়ে নেবে।
১০ বছরের পরিকল্পনার কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী
অনুষ্ঠানে শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিনকে পাশে বসিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতা বিকাশের পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরে করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “তোমাদের মধ্যে যে দক্ষতাগুলো রয়েছে, সেগুলো বের করে আনার পরিকল্পনা আমরা ১০ বছর ধরে করছি। মাহদী আমিন যখন অক্সফোর্ডে পড়ত, তখন আমরা বসে বসে ভাবতাম—যখন আমরা দেশের জন্য কাজ করার সুযোগ পাব, তখন এগুলো করব।”
প্রধানমন্ত্রী জানান, শিক্ষাব্যবস্থায় খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও উদ্ভাবন যুক্ত করার উদ্যোগ হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।
উদ্ভাবনী শিক্ষার্থীদের পুরস্কার প্রদান
‘স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং প্রোগ্রাম’-এর আওতায় দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা, বিজ্ঞানচর্চা ও উদ্যোক্তা মনোভাব বিকাশে কাজ করা হচ্ছে।
গত ১২ জুন দেশব্যাপী এ কর্মসূচি শুরু হয়। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অংশগ্রহণে উপজেলা-থানা, জেলা ও জাতীয়—এই তিন ধাপে আয়োজন করা হয় কর্মসূচিটি।
অনুষ্ঠানে প্রতিটি ধাপের বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয়। বিজয়ী শিক্ষার্থীদের প্রতিটি দলকে ২০ হাজার টাকা করে চেক, পদক ও সনদপত্র দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিজয়ী শিক্ষকদের দেওয়া হয় ৩০ হাজার টাকার চেক ও সনদপত্র।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান বিজয়ীদের হাতে এসব পুরস্কার তুলে দেন।
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন
অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিরও উদ্বোধন করা হয়। পরিবেশ রক্ষা ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবুজায়নের ধারণা তৈরির লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, গীতা পাঠ ও বাইবেলের অংশবিশেষ পাঠ করা হয়। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে একটি ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল স্বাগত বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে সারা দেশের সহস্রাধিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক অংশ নেন। বক্তব্য দেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিভিন্ন বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে নিজেদের অনুভূতি তুলে ধরেন এবং এ ধরনের আয়োজনের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এডুকেশনাল এক্সিলেন্স সাপোর্ট স্কিমের আওতায় প্রথমবারের মতো ‘স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং’ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।