
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য চীনের অন্যতম শীর্ষ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ে পড়াশোনার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও চীনের তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্বাক্ষরিত এক সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) আওতায় আগামী কয়েক বছরে প্রায় ১০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে স্নাতকোত্তর ও ডক্টরাল পর্যায়ে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, শিক্ষক উন্নয়ন, বৃত্তি কর্মসূচি, একাডেমিক বিনিময় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা আরও জোরদারের লক্ষ্যে এ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়েছে।
গতকাল রোববার (২৮ জুন ২০২৬) চীনের তিয়ানজিনে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সফরকালে এ সমঝোতা সই হয়।
তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন বিশ্ববিদ্যালয়টির ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মিং দং। এ সময় ইউজিসির পরিচালক সুলতান মাহমুদ ভূঁইয়া এবং তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনের ডিন অধ্যাপক লি কিয়াং উপস্থিত ছিলেন।
উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে কৌশলগত অংশীদারত্ব
বৈঠকে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতের সাম্প্রতিক অগ্রগতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের উচ্চশিক্ষার বিস্তার, গবেষণার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মানবসম্পদ তৈরিতে বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে কার্যকর অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত সহযোগিতা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক ও গবেষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।
ইউজিসি চেয়ারম্যান তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ অর্থায়নের আওতায় মাস্টার্স ও ডক্টর অব ফিলোসফি (পিএইচডি) পর্যায়ে যৌথ কর্মসূচি চালুর প্রস্তাব দেন।
তিনি বলেন, প্রকৌশল, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, মানবিকসহ দেশের অগ্রাধিকারভিত্তিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষক ও গবেষকদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ প্রয়োজন। যৌথ শিক্ষা ও গবেষণা কর্মসূচি চালু হলে শিক্ষক উন্নয়ন, গবেষণার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সুযোগ বাড়বে।
চীনা ভাষা শিক্ষায় সহযোগিতার প্রস্তাব
বৈঠকে চীনা ভাষা শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। ইউজিসি চেয়ারম্যান বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট ও কনফুসিয়াস ক্লাসরুম প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সাম্প্রতিক দ্বিপক্ষীয় বোঝাপড়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি ভাষা হিসেবে চীনা ভাষার শিক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অধ্যাপক মামুন আহমেদ জানান, ইউজিসি দেশের প্রায় ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষা শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা করছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে দক্ষ ভাষাশিক্ষক, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন এবং একাডেমিক সহায়তা প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, চীনা ভাষা শেখার সুযোগ বাড়লে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
যৌথ গবেষণাগার স্থাপনের উদ্যোগ
বাংলাদেশে যৌথ গবেষণাগার স্থাপনের বিষয়েও আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইউজিসি। অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে গবেষণাগার স্থাপন করা হলে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, যৌথ গবেষণাগার পারস্পরিক আগ্রহের বিষয়ে গবেষণা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং সক্ষমতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর মাধ্যমে দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণার পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানাতে আগ্রহী তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়
তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মিং দং বাংলাদেশের সঙ্গে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাভিত্তিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে বিশ্ববিদ্যালয়টির আগ্রহের কথা জানান।
বৈঠকে দুই পক্ষ স্নাতকোত্তর শিক্ষা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিনিময়, যৌথ গবেষণা, একাডেমিক মবিলিটি, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করে।
তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনের ডিন অধ্যাপক লি কিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং বৈশ্বিক অংশীদারত্বের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
তিনি জানান, বর্তমানে প্রায় ৭০ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছেন। ভবিষ্যতে আরও বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে সেখানে পড়াশোনার সুযোগ দিতে বিশ্ববিদ্যালয়টি আগ্রহী।
সমঝোতা স্মারকে যেসব বিষয় রয়েছে
ইউজিসি ও তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তি ও সহযোগিতা;
যৌথ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা;
শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিনিময়;
যৌথ গবেষণাগার স্থাপন;
চীনা ভাষা শিক্ষা সম্প্রসারণ;
একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন কার্যক্রম।
দ্বিপক্ষীয় শিক্ষা সহযোগিতায় নতুন গতি
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরের পরপরই ইউজিসি ও তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এ উচ্চপর্যায়ের আলোচনা ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর দুই দেশের শিক্ষা ও গবেষণা সহযোগিতার ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং মানুষে-মানুষে যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।