
সাইবার স্পেসে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাইবার সুরক্ষা আইনের অপব্যবহার বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। মঙ্গলবার (১ জুলাই ২০২৬) জাতীয় সংসদে সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) বিল–২০২৬-এর ওপর আলোচনায় তাঁরা এসব দাবি জানান।
সংসদে আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলের সদস্যরা বলেন, সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর আইন প্রয়োজন। তবে সেই আইন যেন সাধারণ নাগরিক, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক কর্মী বা ভিন্নমতের মানুষের কণ্ঠ রোধের হাতিয়ার না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) বিল পাস
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বিলটি পাসের জন্য জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন। বিলের ওপর জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব নিষ্পত্তির পর কণ্ঠভোটে এটি পাস হয়।
সাইবার সুরক্ষা আইনের ২০ ধারা বিলুপ্ত করতে এ সংশোধনী আনা হয়েছে। ওই ধারায় সাইবার স্পেসে জুয়া খেলা সংক্রান্ত অপরাধ ও শাস্তির বিধান ছিল।
সংসদে জানানো হয়, অনলাইন জুয়া ও জুয়া প্রতিরোধে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। ওই আইনে অনলাইন জুয়ার বিস্তারিত সংজ্ঞা ও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ফলে সাইবার সুরক্ষা আইন থেকে এ-সংক্রান্ত ধারা বাদ দেওয়া হচ্ছে।
নারীদের সাইবার নিপীড়ন নিয়ে উদ্বেগ রুমিন ফারহানার
বিলের আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, রাজনীতিবিদ ও জনপরিচিত ব্যক্তিরা নিয়মিত সাইবার নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা যাঁরা রাজনীতি করি, পাবলিক ফিগার, নোন ফেস—তাঁদের প্রতিনিয়ত সাইবার নিপীড়নের শিকার হতে হয়। সাইবার বুলিংসহ নানা ধরনের সাইবার অপরাধের শিকার হতে হয়।’
তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)–এর অপব্যবহার এবং অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ার বিষয়েও উদ্বেগ জানান তিনি।
রুমিন ফারহানা বলেন, বিশেষ করে রাজনীতি ও গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত নারীদের জন্য সাইবার স্পেস দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। নারীদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের আরও মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, নারীরা যে রাজনৈতিক দলেরই কর্মী হোন না কেন, বিরোধী মতের নারীদের অনলাইনে হয়রানি করা সাময়িকভাবে কারও কাছে আনন্দদায়ক মনে হলেও ভবিষ্যতে সেটি সবার জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সাইবার আইন যেন হয়রানির হাতিয়ার না হয়: জামায়াতের এমপিরা
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, অতীতে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে সাইবার আইন ব্যবহার করে হয়রানির অভিযোগ ছিল। রাজনৈতিক নেতারাও এ ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, সাইবার আইন যাতে শিক্ষার্থী, রাজনীতিবিদসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের বিরুদ্ধে অপব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
জামায়াতের সংসদ সদস্য জি এম নজরুল ইসলাম বলেন, সাইবার অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার পাশাপাশি বাক্স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার রক্ষার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
জামায়াতের আরেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, সাইবার অপরাধ, এআইয়ের অপব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য প্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর মতো অপরাধ মোকাবিলায় আইন প্রয়োজন।
তবে এই আইন যেন মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করার কারণ না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
অতীত অভিজ্ঞতার কারণে শঙ্কা রয়েছে: বিরোধীদলীয় নেতা
বিলের আলোচনায় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইন সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে নারীদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা রয়েছে।
তবে অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে আইনটির প্রয়োগ নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আইনের সঠিক ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
অপতথ্য ও গুজব ঠেকাতে নতুন উদ্যোগের কথা জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে চরিত্রহনন, অপতথ্য ছড়ানো, গুজব তৈরি, মানহানিকর কনটেন্ট প্রচার এবং সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করার মতো বিষয়গুলো নিয়ে সরকার আলাদা উদ্যোগ নিচ্ছে।
তিনি বলেন, এসব বিষয়ে মন্ত্রিসভায় আলোচনা হয়েছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই-বাছাই চলছে। প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে পরবর্তী সময়ে সংশোধনী বা নতুন বিল আনা হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাইবার অপরাধ দমন, ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই আইন বাস্তবায়ন করা হবে।