
আল–জাজিরা
কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল অবস্থান করছে, একই সময়ে ইরানের প্রতিনিধিরাও দেশটিতে পৌঁছেছেন। তবে দুই দেশের প্রতিনিধিরা সরাসরি শান্তি আলোচনায় বসেছেন কি না, তা নিয়ে এখনো স্পষ্টতা নেই। বৈঠকের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নানা ইঙ্গিত দেওয়া হলেও ইরান সরাসরি আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। মধ্যস্থতাকারী কাতারও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
এর ফলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা থাকায় দোহায় আসলে কী ধরনের আলোচনা হচ্ছে, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
দোহায় মার্কিন প্রতিনিধিদল, ইরানের অস্বীকার
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফকে কাতারে পাঠিয়েছেন। তাঁরা বর্তমানে দোহায় অবস্থান করছেন।
এর আগে সোমবার মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, দোহায় একটি বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, তেহরানের অনুরোধেই এই বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, ‘দোহায় বৈঠকটি হয়তো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। আমরা তা দেখতে পাব।’
তবে ইরান এ ধরনের সরাসরি বৈঠকের বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার দোহায় একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এটি সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আগের কারিগরি আলোচনার মতো হবে না। এবারের আলোচনার মূল বিষয় হবে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো।
ইরানের দাবি, বৈঠক হবে কাতারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, ইরানের কারিগরি প্রতিনিধিদলের কাতার সফরের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিদলের কোনো সম্পর্ক নেই।
তিনি বলেন, ইরানি প্রতিনিধিরা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা কাতারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করবেন।
তেহরান জানিয়েছে, কাতার ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়ন এবং জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ ছাড় করার বিষয় নিয়ে।
একই সঙ্গে ইরান সতর্ক করেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি স্বাক্ষরিত সমঝোতা ভঙ্গ করে, তাহলে এর কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
সরাসরি আলোচনা নয়, হতে পারে পরোক্ষ কারিগরি বৈঠক
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ স্কট উয়েলিঙ্গার মনে করেন, দোহায় সম্ভবত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হচ্ছে না।
তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালি নিয়ে সম্ভাব্য উত্তেজনা কমাতে ইরানের সঙ্গে পরোক্ষ কারিগরি আলোচনার পথ বেছে নিয়েছে।
স্কট বলেন, ‘আমি মনে করি, যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকেরা পূর্বনির্ধারিত কারিগরি আলোচনাকে ব্যবহার করে সম্ভাব্য বেশ কিছু জটিলতা এড়ানোর চেষ্টা করছেন।’
আলোচনার কেন্দ্রে হরমুজ প্রণালি
আগামী দিনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বড় ধরনের মতবিরোধের কারণ হতে পারে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাণিজ্যপথ এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়।
তেহরান ইতিমধ্যে এই প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছে।
স্কট উয়েলিঙ্গার বলেন, সমঝোতার কাঠামোর মধ্যে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করে অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে একটি জোট গঠন করা ওয়াশিংটনের জন্য সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প হতে পারে। এই জোট হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, কারিগরি আলোচনা চলছে
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কারিগরি আলোচনা চলছে।
ইরান প্রকাশ্যে এসব আলোচনার কথা অস্বীকার করাকে তিনি ‘পারস্য দর-কষাকষির কৌশল’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রচারিত ‘দ্য মাইকেল নোলস শো’ অনুষ্ঠানে ভ্যান্স বলেন, ‘আমাদের এরই মধ্যে যেসব আলোচনা হয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে পূর্বনির্ধারিত কারিগরি আলোচনা হওয়ার কথা। আগামীকাল এটি অনুষ্ঠিত হবে।’
তিনি বলেন, দোহা বৈঠক নিয়ে ইরানের বক্তব্য একই সঙ্গে ‘আকর্ষণীয় ও হতাশাজনক’।
যুদ্ধের পর শান্তি আলোচনার চেষ্টা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমান কূটনৈতিক তৎপরতার পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপট।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে। এর পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়।
যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে গত ১৭ জুন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা স্মারকে পৌঁছায়। এতে মধ্যস্থতা করে কাতার ও পাকিস্তান।
এর ধারাবাহিকতায় সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের কর্মকর্তারা শান্তি আলোচনায় বসেন। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নে দুই দেশ অন্তত ৬০ দিনের সময় নিয়েছে বলে জানা যায়।
তবে দোহায় বর্তমান বৈঠক সরাসরি শান্তি আলোচনার অংশ কি না, নাকি কেবল কারিগরি ও মধ্যস্থতামূলক আলোচনা—তা এখনো স্পষ্ট নয়। দুই দেশের বক্তব্যের পার্থক্যই এ অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।