
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে সম্পাদিত বলে দাবি করা ‘দাসত্বমূলক’ বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে সমাবেশ করেছে বামধারার বিভিন্ন রাজনৈতিক, শ্রমিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ‘বন্দর রক্ষা ও করিডরবিরোধী আন্দোলন’ ব্যানারে আয়োজিত এ সমাবেশ শেষে অংশগ্রহণকারীরা শাহবাগ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য পর্যন্ত মশালমিছিল করেন। পরে মিছিলটি আবার শাহবাগে ফিরে এসে শেষ হয়।
সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের পরিপন্থী। তাঁদের দাবি, দেশের সমুদ্রবন্দর, বিমানঘাঁটি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বিদেশি নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার যেকোনো উদ্যোগ জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বক্তারা আরও দাবি করেন, সেন্টমার্টিন, সোনাদিয়া, মাতারবাড়ী এবং চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে যে বিভিন্ন উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে, তা বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ। তাঁদের ভাষ্য, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিদেশি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
সমাবেশে আরও অভিযোগ করা হয়, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান ও পরিচালনার সুযোগ পেতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ও বিমানঘাঁটি জ্বালানি সংগ্রহ, সরবরাহ এবং অন্যান্য লজিস্টিক কার্যক্রমে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও বক্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বক্তারা বলেন, ২০২৬ সালের ৫ থেকে ৭ মে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের (ইউএসটিআর) একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে। ওই সফরে দুই দেশের মধ্যে পূর্ববর্তী বাণিজ্য চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়। তাঁদের দাবি, ওই আলোচনার পেছনে অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং এগ্রিমেন্ট (ACSA) এবং জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন এগ্রিমেন্ট (GSOMIA) নামে দুটি চুক্তির বিষয় রয়েছে।
সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, এসব চুক্তি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বন্দর ও বিমানঘাঁটি ব্যবহার করে সামরিক ও লজিস্টিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি সক্ষমতা বাড়তে পারে বলেও তাঁরা দাবি করেন।
তবে এসব বক্তব্য ও অভিযোগ সমাবেশে অংশ নেওয়া বক্তাদের নিজস্ব মতামত ও দাবি হিসেবে উপস্থাপিত হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য সমাবেশে তুলে ধরা হয়নি।
সমাবেশে বক্তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের সমুদ্রবন্দর, করিডর ও কৌশলগত অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বন্দর ইজারা এবং বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তিগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা করারও দাবি জানান তাঁরা।
কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবু সাঈদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশ সঞ্চালনা করেন ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন শুভ।
সমাবেশে বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় ক্ষেতমজুর সমিতির সভাপতি ফজলুর রহমান, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর (একাংশ) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে, যুব ইউনিয়নের সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম, হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকান্দার হায়াত, আদিবাসী যুব ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মনিরা ত্রিপুরা এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগের (বিসিএল) সভাপতি গৌতম শীলসহ বামপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক, শ্রমিক, সাংস্কৃতিক ও ছাত্র সংগঠনের নেতারা।
সমাবেশ শেষে আয়োজিত মশালমিছিল শাহবাগ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য প্রদক্ষিণ করে পুনরায় শাহবাগে এসে শেষ হয়। কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সংগঠনগুলোর নেতারা দাবি করেন, দেশের কৌশলগত স্থাপনা ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভবিষ্যতেও তাঁরা জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি অব্যাহত রাখবেন।