
১৯৮৮ সালের ৩ জুলাই। মধ্যপ্রাচ্যে তখন ইরান-ইরাক যুদ্ধের অষ্টম ও শেষ বছর। পারস্য উপসাগরজুড়ে তীব্র সামরিক উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালিতে প্রতিদিনই হামলা-পাল্টা হামলা। এমন এক পরিস্থিতিতে মাত্র সাত মিনিটের একটি ভুল ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বেসামরিক বিমান দুর্ঘটনায় পরিণত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রে ভূপাতিত হয় ইরান এয়ারের ফ্লাইট ৬৫৫। প্রাণ হারান ২৯০ জন আরোহী—যাঁদের মধ্যে ছিলেন ৬৬ শিশু।
ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র এটিকে ‘দুঃখজনক ভুল’ বলে দাবি করলেও ইরান একে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করে। আন্তর্জাতিক বিচারিক লড়াই শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত আদালতের বাইরে ক্ষতিপূরণ দিয়ে বিষয়টির নিষ্পত্তি করে ওয়াশিংটন। তবে আজও ঘটনাটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সামরিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
যুদ্ধের আগুনে হরমুজ প্রণালি
১৯৮০ সালে শুরু হওয়া ইরান-ইরাক যুদ্ধ দীর্ঘ আট বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তোলে। যুদ্ধের শেষ দিকে ইরানের অন্যতম কৌশল ছিল পারস্য উপসাগর হয়ে ইরাকের তেল রপ্তানি ব্যাহত করা। অন্যদিকে ইরাকও পাল্টা হামলা চালাত। ফলে হরমুজ প্রণালি হয়ে চলাচলকারী জ্বালানিবাহী ট্যাংকারগুলো প্রায় প্রতিদিনই হামলার ঝুঁকিতে পড়ত।
সমুদ্রপথে মাইন পেতে রাখা, রকেট হামলা, ট্যাংকারে গোলাবর্ষণ—এসব ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে।
ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য ছিল দুইটি—বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে ইরানকে সামরিক ও কৌশলগত চাপের মধ্যে রাখা।
যুদ্ধজাহাজের মুখোমুখি উত্তেজনা
হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে কাছের বন্দর আব্বাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তখন একই সঙ্গে সামরিক ও বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল। বিমানবন্দরটিতে ইরান এফ-১৪ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছিল। মার্কিন বাহিনীর আশঙ্কা ছিল, এসব যুদ্ধবিমান থেকে তাদের নৌবহরের ওপর হামলা হতে পারে।
এমন উত্তেজনার মধ্যেই ১৯৮৮ সালের ২ জুলাই একটি ইরানি এফ-১৪ যুদ্ধবিমান মার্কিন যুদ্ধজাহাজের কাছাকাছি চলে এলে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়।
পরদিন সকালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। একটি পাকিস্তানি তেলবাহী জাহাজকে ধাওয়া দেয় ইরানের গানবোট। মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ভিনসেন্স এবং ইউএসএস মন্টেগোমারি তখন ওই এলাকায় অবস্থান করছিল এবং পাকিস্তানি জাহাজটিকে নিরাপদে পার করে দেওয়ার চেষ্টা করছিল।
সাত মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে গেল ২৯০ প্রাণ
সেই দিন সকাল ১০টা ১৭ মিনিটে ইরান এয়ারের ফ্লাইট ৬৫৫-এর উড্ডয়নের কথা থাকলেও প্রায় আধা ঘণ্টা বিলম্বে সকাল ১০টা ৪৭ মিনিটে বন্দর আব্বাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে বিমানটি।
এয়ারবাস এ-৩০০ মডেলের ওই যাত্রীবাহী বিমানে ছিলেন ২৭৪ জন যাত্রী ও ১৬ জন ক্রু। তাঁদের মধ্যে ৬৬ জনই ছিল শিশু। গন্তব্য ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই।
উড্ডয়নের মাত্র সাত মিনিট পর বিমানটি যখন অনুমোদিত বাণিজ্যিক রুট ধরে ইরানের আকাশসীমার মধ্যে দিয়ে উড়ছিল, তখন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ভিনসেন্স থেকে দুটি সারফেস-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
এর একটি সরাসরি বিমানে আঘাত হানে। মুহূর্তের মধ্যে মাঝ আকাশে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে পারস্য উপসাগরে বিধ্বস্ত হয় ফ্লাইট ৬৫৫। বিমানে থাকা ২৯০ জনের কেউই বেঁচে ফিরতে পারেননি।
কেন গুলি চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র?
ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী তদন্ত শুরু করে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধজাহাজের রাডারে একটি অজ্ঞাত উড়োজাহাজ শনাক্ত হয়েছিল, যা যুদ্ধজাহাজের দিকে এগিয়ে আসছে বলে ধারণা করা হয়।
তদন্ত অনুযায়ী, বারবার সতর্কবার্তা পাঠানো হলেও পাইলট কোনো সাড়া দেননি। ফলে যুদ্ধজাহাজের ক্যাপ্টেন উইলিয়াম সি. রজার্স মনে করেন, এটি সম্ভবত একটি ইরানি এফ-১৪ যুদ্ধবিমান, যা হামলা চালাতে আসছে।
পরে অবশ্য নিশ্চিত হওয়া যায়, সেটি কোনো যুদ্ধবিমান নয়; বরং নিয়মিত বাণিজ্যিক রুটে চলাচলকারী যাত্রীবাহী বিমান ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী পরবর্তীকালে ঘটনাটিকে "মর্মান্তিক ও দুঃখজনক দুর্ঘটনা" হিসেবে বর্ণনা করে।
পরে প্রমাণিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের দাবিও ভুল ছিল
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে প্রথমে দাবি করা হয়েছিল, বিমানটি আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় অবস্থান করছিল এবং যুদ্ধজাহাজের জন্য হুমকি তৈরি করেছিল।
তবে পরবর্তী তদন্তে দেখা যায়, বিমানটি ইরানের আকাশসীমার মধ্যেই ছিল এবং নির্ধারিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রুট অনুসরণ করছিল। এমনকি বিমানটি যুদ্ধবিমানের মতো নিচের দিকে নামছিল না; বরং স্বাভাবিকভাবেই উচ্চতা বাড়াচ্ছিল।
এ তথ্য প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক মহলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমালোচনা আরও তীব্র হয়।
আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা, পরে সমঝোতা
এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন এবং ২৯০ নিরীহ মানুষের হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলা করে ইরান।
বছরের পর বছর আইনি প্রক্রিয়া চললেও শেষ পর্যন্ত বিচার শেষ হয়নি।
দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৯৬ সালে দুই দেশ আদালতের বাইরে সমঝোতায় পৌঁছে। ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবার ও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির জন্য প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হয় যুক্তরাষ্ট্র।
ওয়াশিংটন এ ঘটনায় "গভীর দুঃখ ও সহানুভূতি" প্রকাশ করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে আইনি দায় স্বীকার করেনি।
সমঝোতার পর ইরান মামলাটি প্রত্যাহার করে নেয়।
শাস্তির বদলে পদক
এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি ছিল ইউএসএস ভিনসেন্সের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন উইলিয়াম সি. রজার্সের পরিণতি।
অনেকেই আশা করেছিলেন, এমন ভয়াবহ ভুলের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিন্তু বাস্তবে ঘটে উল্টো ঘটনা।
১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে সামরিক বাহিনীর অন্যতম সম্মানজনক 'লিজিওন অব মেরিট' পদকে ভূষিত করে। তাঁর পেশাগত অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এ পদক দেওয়া হয়।
এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
ইরানের ক্ষোভ আজও শেষ হয়নি
২০১৯ সালে ফ্লাইট ৬৫৫ ট্র্যাজেডির বার্ষিকীতে তৎকালীন ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র শুধু ভুল করেনি, বরং সেই ভুলের জন্য কখনো প্রকৃত অর্থে ক্ষমাও চায়নি।
তিনি অভিযোগ করেন, নিরীহ মানুষ হত্যার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিকে শাস্তি না দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
রুহানির সরকার পরবর্তীকালে বন্দর আব্বাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করে ‘ফ্লাইট ৬৫৫ শহীদ বিমানবন্দর’ রাখে।
ইতিহাসের এক অপূরণীয় ক্ষত
৩ জুলাই ১৯৮৮ সালের সেই ট্র্যাজেডি শুধু ইরানের জন্য নয়, বিশ্ব বেসামরিক বিমান চলাচলের ইতিহাসেও এক কালো অধ্যায় হয়ে রয়েছে। উড্ডয়নের মাত্র সাত মিনিটের মধ্যে ২৯০ নিরীহ মানুষের প্রাণহানি, আন্তর্জাতিক আইনি লড়াই, ক্ষতিপূরণ এবং বিতর্কিত সামরিক সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে ঘটনাটি আজও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, যুদ্ধনীতি ও মানবিক দায়বদ্ধতা নিয়ে আলোচনায় ফিরে আসে।
ইরানে প্রতি বছর ৩ জুলাই নিহত ২৯০ আরোহীর স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। তাঁদের রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ফ্লাইট ৬৫৫-এর ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রশ্নগুলো এখনো ইতিহাসের আদালতে পুরোপুরি মীমাংসিত হয়নি।