
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেছেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়ন বরাদ্দ বণ্টনের ক্ষেত্রে সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে বৈষম্য করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারি দলের এমপিরা যে পরিমাণ উন্নয়ন বরাদ্দ পাচ্ছেন, বিরোধী দলের এমপিরা তা পাচ্ছেন না। এ ধরনের বৈষম্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং প্রয়োজন হলে এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে।
শুক্রবার (৩ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নেত্রকোনা সার্কিট হাউসের সম্মেলনকক্ষে জেলা জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকার যদি দলীয় বিবেচনায় বৈষম্যমূলক আচরণ করে, তাহলে জনগণের পক্ষ থেকে তার প্রতিবাদ হবে। তিনি বলেন, “সরকার উন্নয়নে বৈষম্য করলে প্রয়োজনে বাঘের গর্জন করা হবে। কোনো কোনো স্থানে আমরা দেখছি, সরকারি এমপি যা বরাদ্দ পাচ্ছেন, বিরোধী দলের এমপিরা তা পাচ্ছেন না। এটা হতে পারে না। আমরা আগেও এমন বৈষম্য দেখেছি। কিন্তু এখন তা আর মেনে নেওয়া হবে না।”
নেত্রকোনার শিল্পায়নে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান
নেত্রকোনার উন্নয়ন প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, জেলার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত শিল্পায়ন হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, এ অঞ্চলে সাদামাটির পাহাড় ও সিলিকন বালুর মতো মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে শিল্পকারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তার মতে, শুধু সরকারের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় উদ্যোক্তা ও বাইরের বিনিয়োগকারীদেরও নেত্রকোনায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে এগিয়ে আসা উচিত। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
মাদক নিয়ন্ত্রণ নয়, নির্মূলের দাবি
মাদক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ডা. শফিকুর রহমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সংসদে একজন সংসদ সদস্য নিজেই উল্লেখ করেছেন যে কোন সীমান্ত এলাকা দিয়ে দেশে মাদক প্রবেশ করছে। একই ব্যক্তি আবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। ফলে তিনি চাইলে সেই পথ দিয়ে মাদক প্রবেশ বন্ধ করতে পারেন।
জামায়াত আমির বলেন, সরকার মাদক নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন আনতে চাইলেও শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, মাদক সম্পূর্ণ নির্মূলের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তার ভাষায়, বর্তমানে শুধু তরুণ সমাজ নয়, বয়স্ক মানুষের মধ্যেও মাদকাসক্তির প্রবণতা বাড়ছে, যা সামাজিকভাবে গভীর উদ্বেগের বিষয়।
সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ প্রতিরোধে অবস্থানের ঘোষণা
ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির। তিনি অভিযোগ করেন, ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ‘পুশ-ইনের’ চেষ্টা চলছে। এ ধরনের উদ্যোগ প্রতিহত করতে দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পাশাপাশি সাধারণ জনগণও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, “ভারত দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পুশ-ইনের চেষ্টা করছে। আমরা তা প্রতিহত করছি। বিজিবির পাশাপাশি আমরা আমাদের জায়গা থেকে সদিচ্ছা নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ব। দেশের এক ইঞ্চি জায়গাও ছাড়ব না, ইনশা আল্লাহ।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ক্ষমতায় আসা প্রায় প্রতিটি সরকারই দাবি করে যে তাদের আমলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে বাস্তবে জনগণ সেই উন্নতির প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতি
জেলা জামায়াতের আমির ছাদেক আহমাদের সভাপতিত্বে এবং জেলা সহকারী সেক্রেটারি জহিরুল ইসলামের সঞ্চালনায় আয়োজিত মতবিনিময় সভায় দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য ও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ময়মনসিংহ অঞ্চল টিমের সদস্য মনজুরুল ইসলাম ভূঁইয়া, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য সাহাবুদ্দিন, নেত্রকোনা-৫ (পূর্বধলা) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মাসুম মোস্তফা, জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মাহবুবুর রহমান, জেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি কামাল উদ্দিন এবং পৌর জামায়াতের আমির আবুল হোসেন তালুকদারসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
মতবিনিময় সভা শেষে ডা. শফিকুর রহমান নেত্রকোনা শহরের মোক্তারপাড়া এলাকায় জেলা পাবলিক হলে আয়োজিত জামায়াতে ইসলামীর ষাণ্মাসিক সদস্য (রুকন) সম্মেলনে যোগ দেন।