
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিদেশ সফরে পাওয়া আন্তর্জাতিক সম্মাননাগুলোকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ ভারত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র সেশেলস সফরে দেশটির একটি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা গ্রহণের পর পুরস্কারের সনদে বানান ভুল, সম্মাননাটি সফরের মাত্র কয়েক দিন আগে প্রবর্তন এবং সনদটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি কি না—এসব প্রশ্ন সামনে আসায় বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশ সফরের সময় মোদির হাতে একের পর এক নতুন বা বিশেষভাবে প্রবর্তিত আন্তর্জাতিক সম্মাননা তুলে দেওয়া হলেও সেগুলোর কিছু নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের দাবি, এসব সম্মাননার মাধ্যমে মোদির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার একটি রাজনৈতিক বার্তা দেশীয় ভোটারদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বলছে, এগুলো ভারতের বৈশ্বিক মর্যাদা ও মোদির নেতৃত্বের স্বীকৃতি।
সেশেলসের সম্মাননা নিয়েই নতুন বিতর্ক
গত সপ্তাহান্তে সেশেলস সফরে পৌঁছালে দেশটির প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিক হারমিনি প্রধানমন্ত্রী মোদির হাতে দেশটির অন্যতম সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘গার্ডিয়ান অব দ্য ব্লু হরাইজন’ তুলে দেন। পুরস্কার গ্রহণের সময় মোদিকে হাস্যোজ্জ্বল দেখা গেলেও অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে সনদটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
সমালোচকেরা লক্ষ্য করেন, পুরস্কারের সনদে Republic শব্দটি ভুল করে Repubblic লেখা হয়েছে। একইভাবে Seychelles-এর পরিবর্তে Seycheeles বানান ব্যবহার করা হয়েছে। একটি রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননার সনদে এমন মৌলিক ভুল কীভাবে রয়ে গেল, তা নিয়েই শুরু হয় বিতর্ক।
বিতর্ক আরও বাড়ে যখন অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া সনদটি বিভিন্ন এআই শনাক্তকারী সফটওয়্যারে পরীক্ষা করা হয়। সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ফলাফলে দাবি করা হয়, সনদের নকশা বা উপাদানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এসব বিশ্লেষণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
পরে জানা যায়, মোদির সফরের মাত্র তিন দিন আগে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সম্মাননাটি চালু করা হয়েছিল এবং এখন পর্যন্ত তিনিই এর প্রথম ও একমাত্র প্রাপক।
সেশেলস সরকারের ব্যাখ্যা
বিতর্কের মুখে বৃহস্পতিবার সেশেলসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি প্রকাশ করে।
তাদের ভাষ্য, ভুলবশত একটি খসড়া সংস্করণ জনসমক্ষে চলে এসেছিল। পরে যথাযথভাবে অনুমোদিত ও সংশোধিত একটি নতুন সনদ ইস্যু করা হয়েছে। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছে, ‘গার্ডিয়ান অব দ্য ব্লু হরাইজন’ সম্মাননাটি সম্পূর্ণ বৈধ ও সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।
কংগ্রেসের কটাক্ষ
বিষয়টি নিয়ে দ্রুতই সরব হয় ভারতের প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস।
দলটির নেতারা অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি যেকোনো আন্তর্জাতিক পুরস্কার গ্রহণের ব্যাপারে অতিরিক্ত আগ্রহী।
কংগ্রেস নেত্রী সুপ্রিয়া শ্রীনেত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, কর্তৃপক্ষ এতটাই তাড়াহুড়া করেছে যে সেশেলস প্রজাতন্ত্রের সরকারি নাম পর্যন্ত সঠিকভাবে লিখতে পারেনি।
তাঁদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির চেয়ে রাজনৈতিক প্রচারের বিষয়টিই এখানে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
বিজেপির পাল্টা অবস্থান
তবে বিজেপি এসব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে।
দলটির মতে, পরিবেশ সংরক্ষণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বে মোদির অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই সেশেলস সরকার তাঁকে এই সম্মাননা দিয়েছে। এটি শুধু মোদির ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং ভারতের জন্যও গর্বের বিষয় বলে দাবি করেছে ক্ষমতাসীন দল।
ইসরায়েল সফরেও একই ধরনের প্রশ্ন
সেশেলসের ঘটনাই প্রথম নয়।
গত মাসে মোদির ইসরায়েল সফরের আগে দেশটির পার্লামেন্ট কনেসেট একটি নতুন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা চালু করে, যার নাম ‘মেডেল অব দ্য নেসেট’।
মোদি সফরে পৌঁছানোর পর তাঁর হাতেই প্রথম এ পদক তুলে দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত তিনিই এর একমাত্র প্রাপক।
এই ঘটনাও সমালোচকদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করে যে, বিদেশ সফরের সঙ্গে মিল রেখে নতুন সম্মাননা প্রবর্তনের প্রবণতা কি রাজনৈতিকভাবে পরিকল্পিত।
‘ফিলিপ কোটলার’ পুরস্কার নিয়েও প্রশ্ন
২০১৯ সালে মোদি ফিলিপ কোটলার প্রেসিডেন্সিয়াল অ্যাওয়ার্ড-এরও প্রথম প্রাপক হন।
তখন সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতাদের প্রতিবছর এই সম্মাননা দেওয়া হবে।
কিন্তু এরপর আর কোনো রাষ্ট্রনেতার হাতে পুরস্কারটি তুলে দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটও বর্তমানে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে, যা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।
‘বিদেশ সফরে পুরস্কার পাওয়া এখন অলিখিত প্রত্যাশা’
দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগতভাবে সংশ্লিষ্ট অনেকেই স্বীকার করেন যে মোদির বিদেশ সফরের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্মাননা পাওয়ার বিষয়টি এখন এক ধরনের অলিখিত প্রত্যাশায় পরিণত হয়েছে।
মোদির জীবনীকার ও লেখক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় মনে করেন, এসব পুরস্কার শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যের অংশ নয়; বরং ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নির্মাণেরও একটি উপাদান।
তাঁর ভাষায়, বিতর্কিত বা প্রশ্নবিদ্ধ পরিস্থিতিতে দেওয়া এসব সম্মাননার মাধ্যমে সমর্থক ও সাধারণ ভোটারদের কাছে এমন একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয় যে, মোদির নেতৃত্বের কারণেই বিশ্বে ভারতের মর্যাদা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি ব্যাপকভাবে সম্মানিত হচ্ছেন।
গত এক বছরে আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক সম্মাননা
গত এক বছরে মোদি আরও কয়েকটি বিদেশি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেয়েছেন।
এর মধ্যে রয়েছে ইথিওপিয়ার ‘গ্রেট অনার নিশান’, যা তিনি প্রথম বিদেশি রাষ্ট্রনেতা হিসেবে গ্রহণ করেন। এছাড়া ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘অর্ডার অব দ্য রিপাবলিক’-ও তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
দুই বিপরীত ব্যাখ্যা
বিদেশ সফরে পাওয়া এসব সম্মাননা নিয়ে এখন দুই ধরনের ব্যাখ্যা সামনে এসেছে।
সমালোচকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে নতুন করে চালু করা বা সীমিত পরিসরের রাষ্ট্রীয় সম্মাননাগুলোকে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নির্মাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সেগুলোর প্রক্রিয়া ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে বিজেপির দাবি, এসব পুরস্কার কোনো ব্যক্তিগত প্রচারণার অংশ নয়; বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভারতের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাব এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বের প্রতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের স্বীকৃতিরই বহিঃপ্রকাশ।