
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে রাজধানী তেহরানে মানুষের ঢল নেমেছে। শনিবার (৪ জুলাই) ভোর থেকেই হাজারো মানুষ ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লার বাইরে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন। ইরানি কর্তৃপক্ষের ধারণা, আগামী তিন দিনে শুধু তেহরানেই দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে, যা দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনসমাবেশে পরিণত হতে যাচ্ছে।
ইরানি রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের অংশ হিসেবে শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায়ের আয়োজন। আগামী সাত দিন ধরে ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, শোকযাত্রা এবং রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরা ও বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
ভোর থেকেই মানুষের ঢল
শনিবার সকাল ছয়টার দিকে তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লার প্রধান ফটক সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এর আগের সন্ধ্যা থেকেই হাজার হাজার মানুষ অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে অবস্থান নিতে শুরু করেন। রাতভর অপেক্ষার পর সকাল নাগাদ পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
ইরানের সর্বস্তরের মানুষ—ধর্মীয় নেতা, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী, নারী-পুরুষ ও সাধারণ নাগরিক—প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে উপস্থিত হন। শুধু খামেনিই নন, তাঁর পরিবারের প্রয়াত কয়েকজন সদস্যের প্রতিও একই অনুষ্ঠানে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।
শ্রদ্ধা জানাতে আসা সোমায়ি হামেদি নামের এক ব্যক্তি এএফপিকে বলেন, “আমরা আমাদের নেতাকে শেষবিদায় জানাতে চাই। তাই এভাবে অপেক্ষা করাটা আমাদের জন্য কষ্টের নয়; এটি আমাদের দায়িত্ব।”
তিন দিনে দুই কোটির সমাগমের আশা
ইরানের সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রায় সাড়ে তিন দশক দেশটির নেতৃত্ব দেওয়া আয়াতুল্লাহ খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আগামী তিন দিনে তেহরানে দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের উপস্থিতি হতে পারে।
এই হিসাব বাস্তবে পূরণ হলে তা হবে ইরানের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় শোকসমাবেশ।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ১৯৮৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজার পর এটিই সবচেয়ে বড় জনসমাগম হতে যাচ্ছে। সে সময় প্রায় এক কোটি মানুষ তাঁর শেষকৃত্যে অংশ নিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
নজিরবিহীন নিরাপত্তা
বিপুল জনসমাগমকে কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ইরান সরকার।
অনুষ্ঠানস্থল ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। অনেক সড়কে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তার স্বার্থে আকাশপথেও সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
মোজতবা খামেনি থাকছেন না
নিরাপত্তাজনিত কারণে বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা ও প্রয়াত নেতার ছেলে মোজতবা আলী খামেনি রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে সরাসরি অংশ নিচ্ছেন না।
ইরানি সূত্রগুলোর দাবি, সম্প্রতি তাঁকে হত্যার হুমকি দিয়েছে ইসরায়েল। সেই নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় তাঁকে জনসমক্ষে না আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইরান থেকে ইরাক, তারপর জন্মভূমি মাশহাদে দাফন
রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি অনুযায়ী, সোমবার খামেনির মরদেহ তেহরান থেকে দক্ষিণাঞ্চলের কোম শহরে নেওয়া হবে। মঙ্গলবার পর্যন্ত সেখানে শোকযাত্রা চলবে।
এরপর বুধবার মরদেহ পৌঁছাবে নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখান থেকে ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায় ব্যাপক জনঅংশগ্রহণে শোকযাত্রার আয়োজন করা হবে।
সবশেষে মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। আগামী শুক্রবার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাশহাদ শহরে অবস্থিত ইমাম রেজার মাজারে তাঁকে দাফন করা হবে। মাশহাদই ছিল খামেনির জন্মস্থান।
যুদ্ধের কারণে পিছিয়েছিল দাফন
প্রাথমিকভাবে চলতি বছরের মার্চ মাসেই খামেনির দাফন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা ছিল। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান দীর্ঘায়িত হওয়ায় সেই পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ৮৬ বছর বয়সে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। ওই দিন থেকেই দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের সূচনা হয়।
পরবর্তীতে সংঘাতের ৪০ দিন পর পাকিস্তানর মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। পরে ১৭ জুন একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে দুই দেশ। বর্তমানে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় স্থায়ী শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে আলোচনা চলছে।
বিদেশি প্রতিনিধিদের শ্রদ্ধা
শুক্রবার বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি এবং কূটনীতিকরা তেহরানে গিয়ে প্রয়াত নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল শোকানুষ্ঠানে অংশ নেয়।
এ ছাড়া শাহবাজ শরিফ, ইমোমালি রহমান, মিখেইল কাভেলাশভিলি, নিকোল পাশিনিয়ান, জেভদেত ইয়িলমাজ এবং দিমিত্রি মেদভেদেভসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা তেহরানে গিয়ে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
ইরানি কর্তৃপক্ষের আশা, আগামী কয়েক দিনের রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান ও শোকযাত্রায় দেশ-বিদেশের লাখো মানুষ অংশ নেবেন এবং এটি হবে দেশটির ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ জাতীয় শোকানুষ্ঠান।