
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের একটি সাধারণ আবাসিক ভবন। বাইরে থেকে দেখলে সেটিকে অন্য যেকোনো বাড়ির মতোই মনে হয়। কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র—ট্রলির ওপর সারি সারি ট্রেতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে শত শত মানব গর্ভফুল (প্লাসেন্টা)। হাসপাতাল থেকে সংগ্রহ করার পর সেগুলো শুকিয়ে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছিল।
পাকিস্তানের তদন্ত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এই ভবনটিকেই ব্যবহার করা হচ্ছিল একটি গোপন প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র হিসেবে। এখান থেকে মানব গর্ভফুল বিদেশে পাচার করা হতো। পরে সেগুলো ব্যবহার করে উচ্চমূল্যের বার্ধক্যরোধী (অ্যান্টি-এজিং) ইনজেকশন তৈরির কাজ চলত।
এমন অভিযোগে একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে পাকিস্তানের ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এফআইএ)। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি।
অভিযান চালিয়ে উদ্ধার ৫০০ কেজি গর্ভফুল
গত সপ্তাহে ইসলামাবাদের ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৫০০ কেজি মানব গর্ভফুল উদ্ধার করে এফআইএ।
অভিযানের সময় বাড়িটিকে একটি অস্থায়ী কারখানার মতো ব্যবহার করা হচ্ছিল বলে জানায় তদন্ত সংস্থা। সংস্থার প্রকাশ করা ছবিতে দেখা যায়, প্লাসেন্টাগুলো শুকিয়ে সংরক্ষণের জন্য বিশেষভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল।
এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে মানবদেহের টিস্যু অবৈধভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পাচারের অভিযোগে তদন্ত চলছে।
প্রতি মাসে হাসপাতাল থেকে সংগ্রহ করা হতো ২০০ কেজি
এফআইএ বিবিসি উর্দুকে জানিয়েছে, চক্রটি ইসলামাবাদসহ বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে প্রতি মাসে প্রায় ২০০ কেজি মানব গর্ভফুল সংগ্রহ করত।
এসব গর্ভফুল শুকিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করার পর বিদেশে পাঠানো হতো।
তদন্তকারীদের মতে, পুরো কার্যক্রমটি দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত সংগঠিতভাবে পরিচালিত হচ্ছিল এবং এতে একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।
বিমানবন্দরে আরও ১০০ কেজি চালান জব্দ
বাড়িতে অভিযানের কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন তথ্য সামনে আসে।
গত ১ জুলাই ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অভিযান চালিয়ে আরও প্রায় ১০০ কেজি মানব টিস্যুর চালান জব্দ করে এফআইএ।
তদন্ত সংস্থার দাবি, চালানটি ভিয়েতনামে পাঠানো হচ্ছিল।
এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সংযোগ আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
হাসপাতাল থেকে ৮০০ রুপিতে কেনা হতো প্রতিটি প্লাসেন্টা
পাকিস্তানের হিউম্যান অর্গান ট্রান্সপ্লান্ট অথরিটির কর্মকর্তা হিনা কানওয়াল জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডির বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে প্রতিটি প্লাসেন্টা প্রায় ৮০০ পাকিস্তানি রুপিতে কিনতেন।
পরে সেগুলো সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করা হতো এবং বিদেশে রপ্তানি করা হতো।
এফআইএর দাবি, বিদেশে পৌঁছানোর পর এসব প্লাসেন্টা দিয়ে বার্ধক্যরোধী ইনজেকশন তৈরি করা হতো, যার প্রতিটির বাজারমূল্য প্রায় ৭ লাখ পাকিস্তানি রুপি বা প্রায় ২ হাজার ৫৩০ মার্কিন ডলার।
শুধু ইসলামাবাদ নয়, আরও কয়েকটি শহরে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক
তদন্তকারীদের ধারণা, এই চক্রের কার্যক্রম শুধু ইসলামাবাদেই সীমাবদ্ধ নয়।
বরং লাহোর, পেশোয়ার, রাওয়ালপিন্ডিসহ দেশের আরও কয়েকটি বড় শহরে একই ধরনের নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকতে পারে।
এ কারণে হাসপাতাল, চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এবং অভিবাসন-সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার সম্ভাব্য সম্পৃক্ততাও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
এফআইএর এক কর্মকর্তা বিবিসি উর্দুকে বলেন, অবৈধ মানব অঙ্গ প্রতিস্থাপনবিরোধী অভিযান আগেও পরিচালনা করা হয়েছে। তবে মানব প্লাসেন্টাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের সন্ধান এবারই প্রথম পাওয়া গেল।
প্রথমে অস্বীকার, পরে স্বীকারোক্তি
তদন্ত সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার পাঁচ সন্দেহভাজন শুরুতে দাবি করেছিলেন, তাঁরা মানুষের নয়, ভেড়ার গর্ভফুল নিয়ে কাজ করছিলেন।
কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তাঁরা স্বীকার করেন, উদ্ধার হওয়া টিস্যুগুলো মানুষের প্লাসেন্টা।
এরপরই তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত করা হয়।
মানব অঙ্গ পাচারে কঠোর শাস্তির বিধান
পাকিস্তানের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, মানব অঙ্গ বা মানবদেহের টিস্যু বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সংগ্রহ, বিক্রি বা পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ পাকিস্তানি রুপি পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সেই আইনেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেন এত মূল্যবান প্লাসেন্টা?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় প্লাসেন্টা হলো গর্ভাবস্থায় জরায়ুর ভেতরে তৈরি হওয়া একটি অস্থায়ী অঙ্গ, যা গর্ভের শিশুর কাছে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছে দেয় এবং শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সন্তান জন্মের পর প্লাসেন্টার কাজ শেষ হয়ে যায় এবং এটি মায়ের শরীর থেকে বেরিয়ে আসে।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মতো পাকিস্তানেও এটিকে চিকিৎসাবর্জ্য হিসেবে গণ্য করা হয় এবং নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ধ্বংস করা হয়।
পাকিস্তানের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ সাদাফ তারিক বলেন, প্লাসেন্টা অত্যন্ত সংক্রামক চিকিৎসাবর্জ্য। তাই এটি সংগ্রহ, পরিবহন ও ধ্বংসের ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।
বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো সীমিত
বিশ্বের কিছু দেশে প্লাসেন্টা নিয়ে গবেষণা চলছে।
কিছু গবেষক ও বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতির সমর্থকদের দাবি, প্লাসেন্টায় থাকা প্রোটিন, আয়রন ও অন্যান্য জৈব উপাদান টিস্যু পুনর্গঠন বা বার্ধক্যের প্রভাব কমাতে সহায়ক হতে পারে। কোথাও কোথাও প্লাসেন্টা থেকে ওষুধ বা ইনজেকশন তৈরির চেষ্টাও হয়েছে।
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব দাবির পক্ষে এখনো পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে প্লাসেন্টাভিত্তিক চিকিৎসা বা অ্যান্টি-এজিং পণ্যের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা মহলে এখনো বিতর্ক রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে এ ধরনের মানব টিস্যু সংগ্রহ, ব্যবহার ও রপ্তানির ক্ষেত্রে আইন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও একেক রকম।