
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শোক ও জানাজা অনুষ্ঠানে বিশ্বের ৭০টির বেশি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেওয়ায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে তেহরান। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে নতুন ‘সার্ভিস ফি’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে ইরান বলেছে, সাম্প্রতিক সংকটের সময় যেসব দেশ তাদের পাশে ছিল, নতুন ব্যবস্থায় সেসব দেশকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স–এ দেওয়া এক বার্তায় জানান, বিশ্বের ৭০টির বেশি দেশের প্রতিনিধি খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তেহরানে এসেছেন। তিনি বলেন, এই উপস্থিতি ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সম্পর্কের ইতিহাসে একটি স্থায়ী স্মৃতি হয়ে থাকবে।
‘চিরস্থায়ী স্মৃতি হয়ে থাকবে’
আব্বাস আরাগচি তাঁর পোস্টে বলেন, ইরান বিশেষভাবে আনন্দিত যে ৭০টির বেশি দেশের প্রতিনিধিদল, যার মধ্যে আরব বিশ্বের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলোর প্রতিনিধিরাও রয়েছেন, তারা প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতাকে সম্মান জানাতে উপস্থিত হয়েছেন।
তাঁর ভাষায়, এই ঐতিহাসিক অংশগ্রহণ দুই পক্ষের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘চিরস্থায়ী স্মৃতি’ হয়ে থাকবে।
রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান উপলক্ষে রাজধানী তেহরানে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছেন। কয়েক দিনব্যাপী এ কর্মসূচির শেষ ধাপে খামেনিকে তাঁর জন্মস্থান মাশহাদে দাফন করার কথা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে আসছে নতুন সার্ভিস ফি
অন্যদিকে চীনে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আবদুর রেজা রহমানি ফাজলি জানিয়েছেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য নতুন সার্ভিস ফি চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এটি কোনো ‘টোল’ বা জোরপূর্বক কর নয়। বরং নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করা, জাহাজ চলাচল তদারকি এবং পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার ব্যয় নির্বাহের অংশ হিসেবে এই ফি আরোপ করা হবে।
ফাজলি বলেন, হরমুজ প্রণালির একটি অংশ ইরানের জলসীমার মধ্যে পড়ায় সেখানে সেবা প্রদানের জন্য ফি ধার্য করার অধিকার তাদের রয়েছে।
বন্ধুরাষ্ট্রগুলো পাবে বিশেষ সুবিধা
বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড পিস ফোরাম–এ বক্তব্য দিতে গিয়ে ইরানি রাষ্ট্রদূত বলেন, সাম্প্রতিক সংকটকালে যেসব দেশ ইরানের পাশে ছিল, নতুন ফি কার্যকর হলে তাদের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
তিনি বলেন, “কঠিন সময়ে যেসব দেশ আমাদের বন্ধু হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছিল, নতুন এ ফি আদায়ের ক্ষেত্রে আমরা অবশ্যই তাদের জন্য বিশেষ ছাড়ের বিষয়টি বিবেচনা করব।”
তাঁর ভাষ্য, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে ইরান ও ওমান যৌথভাবে নতুন ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরির কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি, তবু সিদ্ধান্তে অটল তেহরান
হরমুজ প্রণালিতে নতুন সার্ভিস ফি আরোপের পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আপত্তি জানিয়েছে। তবে ইরান জানিয়েছে, তারা এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছে না।
সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতার অংশ হিসেবে প্রথম ৬০ দিন বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে কোনো অতিরিক্ত ফি ছাড়াই হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কী ধরনের নিয়ম কার্যকর হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
‘নিরাপদ নৌচলাচলই মূল লক্ষ্য’
নতুন ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে রাষ্ট্রদূত ফাজলি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। এর ফলে নিরাপত্তা, নৌপথ ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় অতিরিক্ত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা, নৌযানগুলোর চলাচল তদারকি করা এবং বিপুলসংখ্যক জাহাজের কারণে পরিবেশের ওপর যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে, তা মোকাবিলা করাই আমাদের লক্ষ্য।”
বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে বিবেচিত হরমুজ প্রণালিতে নতুন এ নীতিমালা কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনে এর প্রভাব নিয়ে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।