
ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর হয়ে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেই সামরিক সেবাই একসময় তাঁর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ খুলে দেবে—এমন আশ্বাস পেয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় দুই দশক পর সেই সাবেক সেনাসদস্যই এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের (ডিপোর্টেশন) ঝুঁকিতে রয়েছেন।
তিনি বেনিতো মিরান্দা হার্নান্দেজ। শিশু বয়সে মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা এই সাবেক নৌসেনা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হেফাজতে রয়েছেন। তাঁর ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এনেছে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি এবং বিদেশে যুদ্ধ করা অভিবাসী সেনাসদস্যদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক।
গত বৃহস্পতিবার ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়াগোতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালতের বাইরে হার্নান্দেজের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেন অধিকারকর্মীরা। তাঁদের হাতে ছিল নৌবাহিনীর ইউনিফর্ম পরা হার্নান্দেজের একটি বড় ছবি। ইউনিফর্মের বুকে ঝুলছিল তিনটি স্বর্ণপদক—যা তাঁর সামরিক অবদানের প্রতীক।
‘তিনি আমার ভাই’
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সংগঠন ব্ল্যাক ডিপোর্টেড ভেটেরান্স অব আমেরিকা–এর প্রতিষ্ঠাতা জেমস স্মিথ বলেন, “এটি শুধু একজন মানুষের গল্প নয়। তিনি আমার ভাই—বেনিতো মিরান্দা হার্নান্দেজ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একজন সাবেক সদস্য।”
বিক্ষোভকারীরা যখন আদালতের সামনে তাঁর মুক্তির দাবি জানাচ্ছিলেন, তখন কয়েকশ কিলোমিটার দূরে সান দিয়াগোর ওটেই মেসা অভিবাসন আটককেন্দ্রে বন্দী ছিলেন হার্নান্দেজ।
নাগরিকত্বের আশ্বাস, বাস্তবে ডিপোর্টেশনের মুখে
হার্নান্দেজ ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীতে যোগ দিয়ে ইরাক যুদ্ধে দায়িত্ব পালন করেন।
অভিবাসীদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের সময় দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়ে থাকে, সম্মানের সঙ্গে সামরিক দায়িত্ব পালন করলে দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তাত্ত্বিকভাবে এমন সুযোগ থাকলেও বাস্তবে অনেক অভিবাসী সেনাসদস্য সেই নাগরিকত্ব পাননি। হার্নান্দেজও তাঁদের একজন।
বর্তমানে তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন অভিযানের আওতায় ডিপোর্টেশনের মুখোমুখি।
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থান
দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। বিশেষ করে অপরাধে দণ্ডিত বা অপরাধের রেকর্ড রয়েছে—এমন অভিবাসীদের দ্রুত বহিষ্কারের নীতি অনুসরণ করছে সরকার।
অধিকারকর্মীদের মতে, এই নীতির কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন যেসব অভিবাসী সাবেক সেনাসদস্য এখনো যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করতে পারেননি।
তাঁদের যুক্তি, যুদ্ধফেরত অনেক সেনাসদস্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, ট্রমা কিংবা সামাজিক অভিযোজন সংকটে ভোগেন। এসব কারণে কেউ কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে সেই অপরাধের রেকর্ডই তাঁদের অভিবাসন অবস্থানকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।
কারাগার থেকে বের হয়েই আইসিইর হাতে আটক
মাদক-সংক্রান্ত একটি মামলায় দীর্ঘ কারাদণ্ড ভোগের পর গত ১৪ জুন মুক্তি পান হার্নান্দেজ।
কারাগার থেকে বেরিয়ে মায়ের সঙ্গে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। কিন্তু কারাফটকেই তাঁকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা (আইসিই)।
কিছুক্ষণ পর তাঁর মা মারিয়া মিরান্দা আরেক ছেলেকে নিয়ে সেখানে পৌঁছান। কিন্তু ততক্ষণে হার্নান্দেজকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কয়েক ঘণ্টা ধরে তাঁরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেও তাঁর অবস্থান জানতে পারেননি।
পরবর্তীতে তাঁকে সান দিয়াগোর ওটেই মেসা ডিটেনশন সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চলতি বছরের শুরুতেই হার্নান্দেজ স্থায়ী বাসিন্দার (গ্রিনকার্ডধারী) মর্যাদা পেয়েছিলেন। তবুও এখন তিনি ডিপোর্টেশন প্রক্রিয়ার মুখোমুখি।
কতজন সাবেক সেনা বহিষ্কারের মুখে, তার নির্ভুল তথ্য নেই
যুক্তরাষ্ট্র থেকে কতজন সাবেক সেনাসদস্যকে ইতোমধ্যে ডিপোর্ট করা হয়েছে বা ডিপোর্টেশনের প্রক্রিয়ায় রাখা হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান নেই।
কারণ, দীর্ঘদিন ধরেই আইসিই আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কতজন সাবেক সেনাসদস্য—সে তথ্য নিয়মিত সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে বিভিন্ন অধিকারকর্মী সংগঠনের দাবি, ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে এমন ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস–এর চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর অন্তত ৩৪ জন সাবেক সেনাসদস্যকে ডিপোর্টেশন প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়েছিল।
অধিকারকর্মীদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ অনেক সাবেক সেনাসদস্য নিজেদের মামলা জনসমক্ষে আনতে চান না। তাঁদের আশঙ্কা, এতে আইনি প্রক্রিয়ায় বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
‘এই অভিযান আরও বাড়বে’
মেক্সিকোর তিজুয়ানাভিত্তিক ইউনিফাইড ইউএস ডিপোর্টেড ভেটেরান্স রিসোর্স সেন্টার–এর সহপ্রতিষ্ঠাতা রবার্ট ভিভার বলেন, সারা দেশে আইসিইর অভিযান আরও জোরদার হচ্ছে।
তাঁর মতে, যেসব সাবেক সেনাসদস্য এখনো নাগরিকত্ব পাননি, তাঁদের অনেকেই এই অভিযানের আওতায় পড়ে ডিপোর্টেশনের ঝুঁকিতে পড়বেন।
‘সরকার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি’
অধিকারকর্মী জেমস স্মিথের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিদেশি নাগরিকদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দিয়ে নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে অনেক ক্ষেত্রেই সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি।
তিনি বলেন, সরকার সেনাসদস্যদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে, কিন্তু অবসর নেওয়ার পর সাধারণ জীবনে ফিরে আসতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয় না। যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্য সংকট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা পুনর্বাসনের ঘাটতি অনেকের জীবনকে বিপর্যস্ত করে।
স্মিথের ভাষায়, সরকার নিজের তৈরি পরিস্থিতির দায়ও স্বীকার করতে চায় না।
নাগরিকত্বের আবেদন আটকে যায়
২০০৬ সালে হার্নান্দেজকে নাগরিকত্বের সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়েছিল। কিন্তু এর আগেই একটি ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত হওয়ায় তাঁর নাগরিকত্বের আবেদন বাতিল হয়ে যায়।
অথচ তাঁর সামরিক দায়িত্ব শেষ হয়েছিল প্রায় দুই বছর আগে। অধিকারকর্মীদের দাবি, যুদ্ধকালীন দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর নাগরিকত্ব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে হয়তো আজকের পরিস্থিতি তৈরি হতো না।
কংগ্রেসে বিল, কিন্তু অনিশ্চয়তা কাটেনি
অভিবাসী সাবেক সেনাসদস্যদের সুরক্ষায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে কয়েকটি বিল বিবেচনাধীন রয়েছে।
তবে এসব উদ্যোগ এখনো আইনে পরিণত হয়নি। অন্যদিকে সামরিক বাহিনী এখনো অভিবাসীদের দ্রুত নাগরিকত্বের সুযোগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়োগ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
ছেলের জন্য প্রতি সপ্তাহে দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দেন মা
হার্নান্দেজের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
তাঁর মা মারিয়া মিরান্দা নিয়মিত ছেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং প্রতি শনিবার দেখা করতে অ্যানাহাইম থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে সান দিয়াগোর আটককেন্দ্রে যান।
বয়সের কারণে এই যাতায়াত তাঁর জন্য কষ্টকর হলেও তিনি ছেলেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দিতে চান না।
আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সাক্ষাতে তাঁর ছেলে খুব ভেঙে পড়েছিলেন। বারবার বলছিলেন, “মা, আমি আর তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। এখন আমি সবকিছু ঠিকভাবে করার চেষ্টা করছি। নিজের জন্য প্রার্থনা করছি।”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মারিয়া মিরান্দা বলেন, তাঁর ছেলের সব স্বপ্ন যেন এক মুহূর্তে ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে।
“তারা যেন একটি পাখির ডানা বেঁধে দিয়েছে। তার সব আশা-স্বপ্ন আবর্জনার স্তূপে ছুড়ে ফেলা হয়েছে,” বলেন তিনি।