
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে আবারও ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। সোমবার (৬ জুলাই) ভোরে চালানো এ হামলায় অন্তত ২৩ জন নিহত এবং অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। চলতি বছরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই রাজধানীতে নতুন করে এই বড় ধরনের আক্রমণ চালানো হলো।
ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, রাতভর একাধিক দফায় চালানো হামলায় রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, বহুতল ভবন এবং বেসামরিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছেন। ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ন্যাটো সম্মেলনের আগেই বড় হামলা
এই হামলা এমন এক সময়ে চালানো হলো, যখন তুরস্কে শুরু হতে যাচ্ছে ন্যাটোর বার্ষিক সম্মেলন। সেখানে ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ, পশ্চিমা সামরিক সহায়তা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বৈঠকেরও পরিকল্পনা রয়েছে। যুদ্ধ বন্ধে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে আলোচনার ঠিক আগেই রাশিয়ার এই ব্যাপক হামলাকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
একই পরিবারের তিনজনের মরদেহ উদ্ধার
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো জানিয়েছেন, হামলার পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে একই পরিবারের তিন সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন একজন মা, একজন বাবা এবং তাঁদের সন্তান।
তিনি বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধারকাজ অব্যাহত রয়েছে। অনেক ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ ধসে পড়ায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের সংকটে ইউক্রেন
সাম্প্রতিক হামলায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়া এই হামলায় ২৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। কিন্তু এর একটিও ভূপাতিত করতে পারেনি ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতিই এর অন্যতম প্রধান কারণ।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এ বিষয়ে পশ্চিমা মিত্রদের প্রতি আবারও আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, যতদিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র মিত্র দেশগুলোর গুদামে পড়ে থাকবে এবং ইউক্রেন প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাবে না, ততদিন রাশিয়া বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালাতে আরও উৎসাহিত হবে।
আসন্ন ন্যাটো সম্মেলনে আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদারে ‘শক্তিশালী ও কার্যকর সিদ্ধান্ত’ গ্রহণের আহ্বানও জানান তিনি।
আবাসিক এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলায় কিয়েভের প্রায় ৩০টি আবাসিক ভবন গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানীর ঐতিহাসিক পোদিলস্কি জেলা। সেখানে একটি নয়তলা আবাসিক ভবনের বড় অংশ সম্পূর্ণ ধসে পড়ে।
ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার অভিযান চালানোর সময় অনেক বাসিন্দাকে আটকে থাকতে দেখা যায়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত ভিডিওচিত্রে ভবনের ওপরের তলায় কংক্রিটের নিচে মানুষের দেহাবশেষ আটকে থাকার দৃশ্যও দেখা গেছে।
রাশিয়ার দাবি, লক্ষ্য ছিল সামরিক স্থাপনা
হামলার বিষয়ে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা দূরপাল্লার উচ্চ-নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহার করে ইউক্রেনের সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের দাবি, কিয়েভসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হানা হয়েছে।
তবে ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বলছেন, হামলার বড় অংশই বেসামরিক এলাকায় আঘাত হেনেছে এবং এতে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ও ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
কিয়েভের বাইরে ওদেসাতেও হামলা
রাজধানী কিয়েভ ছাড়াও আশপাশের অঞ্চল এবং কৃষ্ণসাগর উপকূলীয় বন্দরনগরী ওদেসায়ও হামলা চালিয়েছে রাশিয়া।
সেখানেও হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পাল্টা হামলা জোরদার করছে ইউক্রেন
অন্যদিকে ইউক্রেনও রাশিয়ার অভ্যন্তরে ড্রোন হামলার তৎপরতা আরও বাড়িয়েছে।
ইউক্রেনীয় বাহিনী সোমবার রাশিয়ার বাল্টিক সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ভিসোতস্ক এবং দেশটির অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র উস্ত-লুগাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুদ্ধের গতি সীমান্ত অতিক্রম করে রাশিয়ার অভ্যন্তরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ইউক্রেন কৌশলগত জ্বালানি অবকাঠামো, সামরিক ঘাঁটি এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে নিয়মিত ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাঝেও সংঘাত তীব্র
ইউক্রেন যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে গড়িয়েছে। যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকলেও মাঠের লড়াই থামেনি।
ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির সম্ভাব্য বৈঠককে কেন্দ্র করে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের আলোচনা শুরু হলেও তার আগেই কিয়েভে রাশিয়ার এই ভয়াবহ হামলা যুদ্ধের তীব্রতা এবং সমাধানের পথ এখনো কতটা জটিল—সেই বাস্তবতাকেই আবারও সামনে এনে দিয়েছে।