
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে একই দিনে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ দুটি কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। একদিকে কলকাতায় ‘ভারত কেশরী’ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ), সীমান্ত নিরাপত্তা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। অন্যদিকে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার প্রতিবাদে কলকাতায় মোমবাতি মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
একই দিনে অনুষ্ঠিত দুটি কর্মসূচি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ভিন্ন দুই ধরনের বার্তা সামনে এনেছে। বিজেপি যেখানে জাতীয়তাবাদ, নাগরিকত্ব এবং সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়েছে, সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস আইনশৃঙ্খলা ও নারী-শিশুর নিরাপত্তার বিষয়টিকে সামনে এনে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে।
শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির স্মরণে একাধিক কর্মসূচিতে অমিত শাহ
সোমবার কলকাতা সফরে প্রথমে নিউটাউনের ইকোপার্কের ঝিলপাড়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ১২৫ ফুট উচ্চতার একটি ভাস্কর্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ভূমিপূজার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্মারক নির্মাণকাজের সূচনা হয়।
এরপর তিনি ভবানীপুরে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির পৈতৃক বাড়িতে গিয়ে তাঁর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান।
পরে বালিগঞ্জে গিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের বাসভবনেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন অমিত শাহ। প্রায় ১৫ মিনিটের এই বৈঠকে কলকাতার চলচ্চিত্রশিল্পসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের মধ্যে মতবিনিময় হয় বলে জানা গেছে।
‘সোনার বাংলা’ গড়ার আহ্বান
দিনের প্রধান কর্মসূচি ছিল কলকাতার সায়েন্স সিটির পাশের মিলনমেলা প্রাঙ্গণে আয়োজিত শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন অনুষ্ঠান।
সেখানে বক্তব্য দিতে গিয়ে অমিত শাহ বলেন, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির জন্মবার্ষিকী থেকেই বাংলায় নতুন করে ‘সোনার বাংলা’ গড়ার যাত্রা শুরু হচ্ছে। তাঁর মতে, শ্যামাপ্রসাদের আদর্শ ও চিন্তাধারাকে ধারণ করেই আজকের বিজেপি এগিয়ে যাচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেস, বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল কংগ্রেস শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেনি।
অমিত শাহ বলেন, কাশ্মীরকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে রাখার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে অতীতের কংগ্রেস সরকার কোনো কার্যকর তদন্ত করেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সিএএ ও সীমান্ত নিরাপত্তার পক্ষে কেন্দ্রের অবস্থান
অনুষ্ঠানে বক্তব্যে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপও তুলে ধরেন অমিত শাহ।
তিনি বলেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) কার্যকর করার মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার।
এ ছাড়া সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অমিত শাহ দাবি করেন, কেন্দ্রীয় সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করেছে এবং সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে জম্মু ও কাশ্মীরকে দেশের মূলধারার সঙ্গে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত করেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘বন্দে মাতরম’-এর রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ঐতিহ্য বাংলার গর্ব। উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে একসূত্রে গেঁথে তাঁদের আদর্শ অনুসরণ করে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বারুইপুরে শিশু ধর্ষণ-হত্যার প্রতিবাদে মমতার মোমবাতি মিছিল
অন্যদিকে একই সন্ধ্যায় কলকাতার রাজপথে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার প্রতিবাদে কালীঘাটের নিজ বাসভবন থেকে মোমবাতি মিছিলের নেতৃত্ব দেন তিনি।
মিছিলটি কালীঘাট এলাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এতে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-কর্মী, সমর্থক এবং সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
মিছিলজুড়ে অংশগ্রহণকারীরা ‘জাস্টিস ফর বারুইপুর’ (বারুইপুরের জন্য বিচার চাই) স্লোগান দেন এবং দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
আর জি কর আন্দোলনের স্মৃতি ফিরে এল
বারুইপুরের ঘটনার প্রতিবাদে ওঠা ‘জাস্টিস ফর বারুইপুর’ স্লোগান অনেকের কাছেই গত বছরের বহুল আলোচিত ‘জাস্টিস ফর আর জি কর’ আন্দোলনের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে।
কলকাতার আর জি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এক নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর চিকিৎসক সমাজ, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষের ব্যাপক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান স্লোগান ছিল ‘জাস্টিস ফর আর জি কর’।
পর্যবেক্ষকদের মতে, বারুইপুরের সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ভিন্ন বার্তায় একই দিনের রাজনীতি
একই দিনে অনুষ্ঠিত দুটি কর্মসূচি পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে বিজেপি জাতীয় নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, সীমান্ত সুরক্ষা এবং আদর্শিক রাজনীতির প্রশ্নকে জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, অপরাধ দমন এবং বিচার নিশ্চিত করার দাবিকে কেন্দ্র করে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে।
ফলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে জাতীয় ইস্যুর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নও সমান গুরুত্ব নিয়ে আলোচনায় থাকবে।