
রাজধানীর সেন্ট যোসেফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে দুই দিনব্যাপী অভ্যন্তরীণ গণিত উৎসব ‘যোসেফাইট ইন্ট্রা ম্যাথ ফিয়েস্তা ২০২৬’। ২ ও ৩ জুলাই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে শিক্ষার্থীদের মেধা, বিশ্লেষণাত্মক দক্ষতা, যৌক্তিক চিন্তা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতার এক প্রাণবন্ত প্রদর্শনী দেখা যায়।
‘Let Infinity Be Your Limit’—এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে আয়োজিত উৎসবের লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি, সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ এবং সৃজনশীল ও বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার বিকাশে একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। সেন্ট যোসেফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণিতভিত্তিক সংগঠন যোসেফাইট ম্যাথ ক্লাব (জেএমসি) পুরো আয়োজনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করে।
চারটি ক্যাটাগরিতে প্রতিযোগিতা
শুধুমাত্র সেন্ট যোসেফের শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত এই উৎসবে অংশগ্রহণকারীদের বয়স ও শ্রেণি অনুযায়ী চারটি বিভাগে ভাগ করা হয়—প্রাইমারি, জুনিয়র, সেকেন্ডারি এবং হায়ার সেকেন্ডারি।
জেএমসির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিবন্ধন সম্পন্ন করে বিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। দুই দিনজুড়ে ক্যাম্পাসজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ, যেখানে একাডেমিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, দলগত কাজ এবং স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার পরিবেশও গড়ে ওঠে।
বৈচিত্র্যময় প্রতিযোগিতা
উৎসবে এমন সব প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়, যা শুধু গণিতজ্ঞান নয়, বরং যুক্তি, কৌশল, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকেও মূল্যায়ন করে।
সব ক্যাটাগরির শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল ম্যাথ অলিম্পিয়াড, সুডোকু, আইকিউ টেস্ট, ক্রিপ্টোম্যানিয়া এবং রুবিকস কিউব প্রতিযোগিতা।
অন্যদিকে প্রাইমারি ও জুনিয়র বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে রাখা হয় ‘হিউম্যান ক্যালকুলেটর’ এবং ‘টিক-ট্যাক-টো’ প্রতিযোগিতা, যা ছোট শিক্ষার্থীদের দ্রুত গণনা ও যৌক্তিক চিন্তার দক্ষতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি করে।
সেকেন্ডারি ও হায়ার সেকেন্ডারি বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল আরও চ্যালেঞ্জিং কিছু ইভেন্ট। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘ক্যালকুলাস বি’, ‘জ্যামিতি ড্যাশ’, ‘প্রবাবিলিটি প্রেশার’, ‘সিঙ্গুলারিটি’ এবং দলগত সমস্যা সমাধানভিত্তিক আকর্ষণীয় ‘এস্কেপ রুম’ প্রতিযোগিতা। এসব আয়োজন শিক্ষার্থীদের বাস্তবধর্মী সমস্যা বিশ্লেষণ, সময় ব্যবস্থাপনা এবং দলগত সমন্বয়ের দক্ষতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জমকালো সমাপনী অনুষ্ঠান
উৎসবের শেষ দিনে অনুষ্ঠিত হয় পুরস্কার বিতরণী ও সমাপনী অনুষ্ঠান। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক নেপাল চন্দ্র রায়।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সেন্ট যোসেফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের উপাধ্যক্ষ ব্রাদার নিপু রোজারিও, সিএসসি, যোসেফাইট ম্যাথ ক্লাবের মডারেটর অসীম কুমার হালদার, বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাস এবং যোসেফাইট ম্যাথ ক্লাবের সভাপতি তাওহীদ বিন ওমর।
বক্তারা শিক্ষার্থীদের গণিতচর্চার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, আধুনিক বিশ্বে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল হতে যুক্তিবোধ ও বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার বিকল্প নেই। এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের শুধু প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য নয়, ভবিষ্যতের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠতেও সহায়তা করবে।
বিজয়ীদের সম্মাননা
বক্তব্য পর্ব শেষে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও ক্যাটাগরির বিজয়ীদের হাতে মেডেল ও সনদ তুলে দেন অতিথিরা। এ সময় বিজয়ীদের অভিনন্দন জানিয়ে ভবিষ্যতেও গণিতচর্চা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তারা।
পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি হলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিত নিয়ে উৎসাহ, আনন্দ এবং নতুন করে শেখার আগ্রহ দীর্ঘদিন অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে আশা প্রকাশ করেন আয়োজকরা।
সহযোগী প্রতিষ্ঠান
এবারের যোসেফাইট ইন্ট্রা ম্যাথ ফিয়েস্তা ২০২৬ সফলভাবে আয়োজনের পেছনে সহযোগী হিসেবে যুক্ত ছিল দেশের কয়েকটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ছিল দৈনিক প্রথম আলো, সিপি ফাইভ স্টার, বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী বিজ্ঞানচিন্তা, শিক্ষাবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পিএফইসি গ্লোবাল, কিশোরদের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন কিশোর আলো এবং মেরিডিয়ান।
গণিতভীতি দূর করার উদ্যোগ
আয়োজকদের ভাষ্য, এই আয়োজন কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতভীতি দূর করা, যুক্তিনির্ভর চিন্তাকে উৎসাহিত করা এবং নতুন প্রজন্মকে গণিত ও বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তোলার একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। তারা মনে করেন, এ ধরনের নিয়মিত আয়োজন শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গণিত ও বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্যও প্রস্তুত করে তুলবে।
দুই দিনের এই বর্ণাঢ্য আয়োজন শেষ হলেও অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের জন্য এটি হয়ে থাকবে শেখা, চ্যালেঞ্জ গ্রহণ, বন্ধুত্ব এবং গণিতকে নতুনভাবে আবিষ্কারের এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।