
পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে এক নাবালিকাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র উঠে এসেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটির শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে এবং প্রাথমিক আলামত থেকে ধারণা করা হচ্ছে, তাকে জীবিত অবস্থায় পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘটনাস্থল ও নিহত শিশুর বাড়ি পরিদর্শন করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দিয়েছেন। অন্যদিকে ঘটনার প্রতিবাদে কলকাতায় মিছিল করার অনুমতিও দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট।
ময়নাতদন্তে উঠে এলো নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র
দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পুলিশের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে শিশুটির শরীরে ২৮টিরও বেশি ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গেছে।
প্রাথমিক ফরেনসিক পর্যবেক্ষণে আরও জানা যায়, শিশুটির পাকস্থলীতে পানি পাওয়া গেছে। তদন্তকারীদের ধারণা, এর অর্থ তাকে যখন পুকুরে ফেলা হয়েছিল, তখন সে জীবিত ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পানিতে ডুবে যাওয়া এবং মাথায় গুরুতর আঘাতজনিত অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ—এই দুই কারণ মিলেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঁচড়, কামড়ের দাগ, আঘাতের চিহ্ন এবং মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধার আলামতও পাওয়া গেছে।
তবে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
কী ঘটেছিল
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের তথ্যমতে, গত শনিবার বিকেলে শিশুটি এক বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার পথে চার যুবক তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে পুকুরপাড়ের একটি ঝুপড়িতে নিয়ে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়।
পরে শিশুটি গুরুতর আহত ও মৃতপ্রায় হয়ে পড়লে অভিযুক্তরা প্রথমে তাকে একটি প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরার চেষ্টা করে। ব্যাগটি ছিঁড়ে যাওয়ায় তারা তাকে সরাসরি পাশের পুকুরে ফেলে দেয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পরদিন সকালে স্থানীয়রা পুকুর থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করেন।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আনন্দ সর্দার, প্রভাস মণ্ডল ও দিবাকর সর্দার নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অন্য অভিযুক্তদের খুঁজে বের করার কার্যক্রমও চলছে বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পরিবারের পাশে মুখ্যমন্ত্রী
মঙ্গলবার বারুইপুরে গিয়ে নিহত শিশুর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারকে আশ্বস্ত করে বলেন, এই নৃশংস অপরাধের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না এবং প্রত্যেককে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।
মুখ্যমন্ত্রী পরে আরেক নিহত যুবক প্রসেনজিতের পরিবারের সঙ্গেও দেখা করেন।
প্রথমদিকে জনতার গণপিটুনিতে প্রসেনজিতের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও, পরবর্তীতে পুলিশ জানায়, খেলাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধে পাঁচ যুবকের হামলায় তিনি নিহত হন।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই হত্যাকাণ্ডেরও নিরপেক্ষ তদন্ত হবে এবং প্রসেনজিতের পরিবারও ন্যায়বিচার পাবে।
পুলিশের প্রতি কঠোর বার্তা
বারুইপুর সফরকালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও কঠোর অবস্থান নেন মুখ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, যারা ঘটনার পর রেললাইনে হামলা, ভাঙচুর বা পুলিশের যানবাহনে আক্রমণ করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনকে দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের গাফিলতি না করার নির্দেশ দিয়ে তিনি রাজ্যের পুলিশ মহাপরিচালক (ডিজি) সিদ্ধিনাথ গুপ্তকে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
মঙ্গলবার নিহত শিশুর বাড়িতে যান বিজেপির নেত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ও লকেট চট্টোপাধ্যায়সহ ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল।
অন্যদিকে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, সায়নী ঘোষ, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য ও শিউলি সাহা নিহতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানান।
এ ছাড়া সিপিএম এবং আইএসএফের প্রতিনিধিরাও পরিবারটির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
মিছিলের অনুমতি দিল হাইকোর্ট
ঘটনার প্রতিবাদে কলকাতায় প্রতিবাদ মিছিল আয়োজনের অনুমতি চেয়ে কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন করেছিল তৃণমূল যুব ও ছাত্র পরিষদ।
মঙ্গলবার বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য কিছু শর্তসাপেক্ষে সেই মিছিলের অনুমতি দেন।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, বুধবার দুপুর আড়াইটায় বালিগঞ্জ ফাঁড়ি থেকে মিছিল শুরু হয়ে বিকেল সাড়ে চারটায় হাজরা মোড়ে শেষ হবে।
হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, মিছিলটি রাস্তার একপাশ দিয়ে পরিচালনা করতে হবে এবং এতে এক হাজারের বেশি মানুষ অংশ নিতে পারবেন না।
এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তৃণমূল নেত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।
তদন্ত অব্যাহত
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে এবং ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ফরেনসিক পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও অন্যান্য আলামতের ভিত্তিতে অভিযোগপত্র প্রস্তুতের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে নাবালিকার ওপর সংঘটিত এই নৃশংস ঘটনার দ্রুত বিচার এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে।