
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আসন্ন শীর্ষ বৈঠকের আগে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে কয়েক হাজার কোটি ডলারের নতুন অস্ত্র ক্রয় ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে উত্তর আটলান্টিক জোট (ন্যাটো)। ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর যে দাবি দীর্ঘদিন ধরে করে আসছেন ট্রাম্প, নতুন এই উদ্যোগকে তারই বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটোর প্রতিরক্ষাশিল্প ফোরামে জোটের মহাসচিব মার্ক রুতে এসব উদ্যোগের ঘোষণা দেন। বহুজাতিক অস্ত্র ক্রয়, ড্রোন প্রতিরক্ষা, নজরদারি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ইউক্রেনের জন্য সামরিক সহায়তা জোরদারের মতো একাধিক পরিকল্পনা অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়।
বহুজাতিক অস্ত্র ক্রয়ে নতুন জোট
আঙ্কারার অনুষ্ঠানে উৎসবমুখর পরিবেশে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে নতুন প্রতিরক্ষা উদ্যোগ ঘোষণা করেন মহাসচিব মার্ক রুতে।
তিনি বলেন, যৌথভাবে কাজ করলে সদস্যদেশগুলো আরও দ্রুত এবং কার্যকরভাবে প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে পারবে।
রুতে বলেন, “একসঙ্গে কাজ করলে আমরা আরও বেশি কিছু করতে পারি। ন্যাটোর মিত্ররা নতুন বহুজাতিক ক্রয় জোটে যোগ দিচ্ছে। এতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম আরও সহজে সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।”
সম্মেলনের আগে বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল। ফলে এটি অনুষ্ঠানের অন্যতম বড় চমক হিসেবে বিবেচিত হয়।
ড্রোন ও নজরদারি বিমানে বড় বিনিয়োগ
নতুন চুক্তির আওতায় ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান নর্থরপ গ্রুম্যান থেকে উন্নত নজরদারি ড্রোন সংগ্রহ করবে।
এ ছাড়া সুইডেনের প্রতিরক্ষা কোম্পানি সাব (Saab)–এর কাছ থেকে উন্নত নজরদারি ও সামরিক বিমান কেনার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
ন্যাটো জানিয়েছে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। সে কারণে নজরদারি এবং ড্রোন প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানো এখন জোটের অন্যতম অগ্রাধিকার।
ড্রোন প্রতিরোধে ৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ
মার্ক রুতে জানান, আগামী পাঁচ বছরে ড্রোনবিরোধী প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো ৪০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ড্রোননির্ভর যুদ্ধের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে ন্যাটো এখন বিমান প্রতিরক্ষার পাশাপাশি ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
ইউরোপেই ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের পরিকল্পনা
ইউক্রেন যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র জার্মানি ও ইউরোপের অন্যান্য দেশের সঙ্গে যৌথভাবে ইউরোপেই ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের বিষয়ে আলোচনা করছে।
ন্যাটো কর্মকর্তাদের মতে, ইউরোপে উৎপাদন বাড়ানো গেলে সরবরাহব্যবস্থা আরও দ্রুত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সদস্যদেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতাও শক্তিশালী হবে।
প্রতিরক্ষা ব্যয়ে বড় বৃদ্ধি
দীর্ঘদিন ধরেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করে আসছেন, ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট ব্যয় করছে না এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল।
মার্ক রুতে জানান, রাশিয়ার নিরাপত্তা হুমকি এবং ট্রাম্পের চাপ—দুই কারণেই ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যরাষ্ট্র ও কানাডা মিলিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যয় ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।
সব মিলিয়ে এ বছর তাদের মোট প্রতিরক্ষা ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫৭০ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি।
তুরস্কের এফ–৩৫ কর্মসূচিতে ফেরার সম্ভাবনা
শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের বৈঠকেরও কথা রয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে আবার এফ–৩৫ স্টিলথ যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
রাশিয়ার কাছ থেকে এস–৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার কারণে ২০১৯ সালে তুরস্ককে এ কর্মসূচি থেকে বাদ দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
যদি তুরস্ককে পুনরায় কর্মসূচিতে ফিরতে দেওয়া হয়, তবে তা দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে।
ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে সামরিক অভিযানের পর ন্যাটোর ভেতরে কিছু মতপার্থক্যও তৈরি হয়।
ওই অভিযানে সরাসরি সমর্থন না দেওয়ায় ট্রাম্প কয়েকটি ইউরোপীয় মিত্রদেশের সমালোচনা করেন।
তবে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের দাবি, সামরিক অভিযানে অংশ না নিলেও তারা যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুবিধা দিয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং ইউক্রেন যুদ্ধ—দুই সংকটই ন্যাটোর অভ্যন্তরে নতুন কৌশলগত সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে তুলেছে।
ইউরোপ থেকে সেনা কমানোর পরিকল্পনা
যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইউরোপে মোতায়েন সেনাসংখ্যা কমানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে।
এদিকে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মতবিরোধ ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে অতিরিক্ত উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ইউক্রেনের জন্য নতুন সহায়তা
শীর্ষ সম্মেলনে ইউক্রেনের জন্য নতুন সামরিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণারও সম্ভাবনা রয়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো এ বছর ইউক্রেনের জন্য ৭০ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে।
এই সম্ভাব্য ঘোষণা এমন এক সময়ে আসছে, যখন সোমবার কিয়েভে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন।
সাম্প্রতিক ওই হামলার পর ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাটোর নতুন প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ, যৌথ অস্ত্র উৎপাদন এবং ইউক্রেনকে অতিরিক্ত সহায়তার পরিকল্পনা ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি রাশিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানোর কৌশলেরই অংশ।