
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেমন ‘উন্নয়নের গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছিল, তেমনি বর্তমান সরকার যদি ‘ফ্যামিলি কার্ডের গণতন্ত্র’ কিংবা ‘কৃষি কার্ডের গণতন্ত্র’ দিয়ে জনগণকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করে, তাহলে তার পরিণতিও ভিন্ন হবে না।
বুধবার (৮ জুলাই) রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক জাতীয় সেমিনারে তিনি এ মন্তব্য করেন। ‘জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই গণহত্যার মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং আমাদের দায়বদ্ধতা’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে ১১–দলীয় ঐক্য।
বিএনপিকে নিয়ে মন্তব্য
সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে বিএনপিকে ইঙ্গিত করে মামুনুল হক বলেন, ছোটবেলায় খেলাধুলার সময় যারা ভালো খেলতে পারত না, তাদের ‘দুধভাত’ হিসেবে দলে রাখা হতো। সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি দাবি করেন, তাঁদের রাজনৈতিক জোটেও বিএনপিকে একইভাবে রাখতে চাওয়া হয়েছিল। তবে বিএনপি এখন ‘ফাউল’ করা শুরু করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মামুনুল হক বলেন, বিএনপির কর্মকাণ্ডের কারণে যদি তারা ‘লাল কার্ড’ পায়, তাহলে দলটির পরিণতি ভালো হবে না। অতীতের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিবারই বিএনপির ওপর নির্ভর করতে গিয়ে সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তাঁর ভাষ্য, ক্ষমতায় যাওয়ার পর দলটি প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন করেনি।
তিনি আরও বলেন, এবার বিএনপির ওপর নির্ভর না করে বিকল্প রাজনৈতিক পথ অনুসরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, বিএনপি যদি ‘জুলাই বিপ্লবের চেতনা’ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়, তাহলে বিদ্যমান রাজনৈতিক ঐক্য আরও শক্তিশালী হবে এবং একসময় তা বিএনপির বিরুদ্ধেই গণআন্দোলনে রূপ নিতে পারে।
জুলাই জাদুঘর দ্রুত চালুর দাবি
সেমিনারে জুলাই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে একটি জাদুঘর দ্রুত চালুর দাবি জানান মামুনুল হক। তিনি বলেন, চলতি জুলাই মাসের মধ্যেই ‘জুলাই জাদুঘর’ চালু করা উচিত। অন্যথায় বিষয়টি নিয়েও বড় ধরনের বিতর্ক বা আন্দোলনের সৃষ্টি হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জুলাই অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, এই আন্দোলনের চেতনা সময়ের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করেছে। তাঁর দাবি, বিএনপি, আওয়ামী লীগ কিংবা ভারত—কেউই এই আন্দোলনের অগ্রযাত্রা থামাতে পারবে না।
‘সংস্কার প্রশ্নে বিএনপি পিছিয়ে যাচ্ছে’—আখতার হোসেন
একই সেমিনারে বক্তব্য দেন এনসিপির সদস্যসচিব ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপি ধীরে ধীরে তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে।
আখতার হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের আগেই রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। বিএনপিও তাদের ৩১ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে দলটি প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিরোধিতা করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি প্রকাশ্যে সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিলেও বাস্তবে সেই অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যায়নি। তাঁর দাবি, গণভোটের সময় দলটি প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে থাকলেও আন্তরিকভাবে সেই প্রক্রিয়াকে সমর্থন করেনি।
‘জুলাইয়ের চেতনাকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে’
জুলাই অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে আখতার হোসেন বলেন, ওই আন্দোলন না হলে দেশ এখনো ‘ফ্যাসিবাদের জাঁতাকলে’ পিষ্ট থাকত। তাঁর অভিযোগ, বর্তমানে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নানা পরিচয়ে সামনে এসে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, কেউ চিত্রনায়িকা, কেউ মডেল, আবার কেউ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের পরিচয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বললেও বাস্তবে জুলাইয়ের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেশকে পেছনের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের উপস্থিতি
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধানসহ ১১–দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।