
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর এক হামলায় মিসরীয় ত্রাণ কমিটির জনসংযোগ পরিচালক মোহাম্মদ ফাওয়াজ আল-ওয়াহিদি নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনি শুধু ত্রাণ কার্যক্রমের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন না, গাজা শহরে বড় পর্দায় মিসর–আর্জেন্টিনা ফুটবল ম্যাচ সম্প্রচারের আয়োজনের দায়িত্বও পালন করছিলেন।
প্যালেস্টাইন ইনফরমেশন সেন্টার, আরবি পোস্ট এবং ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ–এর খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার গাজা সিটির আল-সাবরা এলাকায় একটি বেসামরিক গাড়িকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। এতে আল-ওয়াহিদিসহ অন্তত তিনজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। এ ছাড়া হামলায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।
ম্যাচ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগেই হামলা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিসর ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার একটি বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে হামলার ঘটনাটি ঘটে।
মিসরীয় ত্রাণ কমিটি গাজা শহরের বাসিন্দাদের জন্য বড় পর্দায় ম্যাচটি দেখানোর আয়োজন করেছিল। ওই আয়োজনের সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন মোহাম্মদ ফাওয়াজ আল-ওয়াহিদি।
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, হামলার কিছুক্ষণ আগেই তিনি আল-সাবরা এলাকায় একটি সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তি–সংক্রান্ত বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন। বৈঠক শেষে প্রশাসনিক ভবনের কাছাকাছি পৌঁছালে তাঁর বহনকারী গাড়িতে হামলা চালানো হয়।
সমাজসেবক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন
মিসরীয় ত্রাণ কমিটির একজন মুখপাত্র জানান, আল-ওয়াহিদি গাজা সিটিতে কমিটির সদর দপ্তরে প্রবীণদের একটি সংস্থার কার্যালয়ের পরিচালকের দায়িত্বও পালন করতেন।
তাঁর ভাষ্য, সমাজের বিভিন্ন বিরোধ মীমাংসা এবং সাধারণ মানুষের সেবায় নিরলসভাবে কাজ করার কারণে আল-ওয়াহিদি স্থানীয়ভাবে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
মুখপাত্র বলেন, মানুষের কল্যাণে তাঁর অবদান এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার জন্য তিনি সবার কাছে শ্রদ্ধেয় ছিলেন।
একই দিনে আরও হামলা
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার গাজাজুড়ে ইসরায়েলি হামলায় মোট নিহতের সংখ্যা অন্তত সাতজনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন।
নাসের হাসপাতালের চিকিৎসাকর্মী এবং স্থানীয় সূত্রের বরাতে হারেৎজ জানিয়েছে, একই দিনে গাজার দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনিস এবং উত্তর গাজার কয়েকটি এলাকাতেও পৃথক ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
গাজায় ত্রাণ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই মিসরীয় ত্রাণ কমিটি গাজায় বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
সংস্থাটি খাদ্য বিতরণ, যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় ধ্বংসস্তূপ অপসারণ, বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আশ্রয়শিবির পরিচালনা এবং জরুরি মানবিক সহায়তা সমন্বয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে।
এ ছাড়া গাজার সাধারণ মানুষের জন্য বড় পর্দায় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, বিশেষ করে বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ প্রদর্শনের আয়োজনের কারণেও সংস্থাটি পরিচিত।
যুদ্ধবিরতি আলোচনা চলাকালে হামলা
এই হামলার সময় মিসরের রাজধানী কায়রোতে গাজা যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে আলোচনা চলছিল।
হারেৎজ–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার ঘটনার পর মিসর সরকার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েলের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে।
তবে হামলার বিষয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
যুদ্ধবিরতির পরও অব্যাহত সহিংসতা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও এরপরও গাজায় একাধিক সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে ইসরায়েল।
স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গত আট মাসে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ৭২ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং আরও ৩ হাজার ৪৬৩ জন আহত হয়েছেন।
গাজায় চলমান সংঘাত, মানবিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টার মধ্যেই আল-ওয়াহিদির মৃত্যু নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তথ্যসূত্র: প্যালেস্টাইন ইনফরমেশন সেন্টার, আরবি পোস্ট ও হারেৎজ