
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা বাজেট আগামী অর্থবছর থেকে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না বলে আশ্বস্ত করেছেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ। তিনি বলেছেন, সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দীর্ঘদিনের স্বায়ত্তশাসনের চর্চা অক্ষুণ্ন রেখে গবেষণা বাজেট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছ, কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক একটি কাঠামো গড়ে তোলা হবে।
বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) ইউজিসিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের গবেষণা বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সংগঠন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। পরে ইউজিসির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সভার বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়।
সভায় ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, গবেষণা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত কমিটি গঠন করা হবে। পাশাপাশি গবেষণা বাজেটের পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা, মূল্যায়ন ও বাস্তবায়নের জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করবে ইউজিসি।
তিনি বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গবেষণা বাজেট একটি নির্দিষ্ট কোডের মাধ্যমে ইউজিসির অধীনে বরাদ্দ দেওয়া হবে। ইউজিসি সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে। তবে এ প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা, মতবিনিময় ও সমন্বয়ের ভিত্তিতে একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যাতে কোনো ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা গবেষণা কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি না করে।
সভায় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের সভাপতি এবং একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এস এম আবদুর রাজ্জাক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব বাজেট কোডের পরিবর্তে ইউজিসির কোডের মাধ্যমে গবেষণা বাজেট বরাদ্দ দেওয়ার কারণে কিছু প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে সরকারের গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা উন্নয়নের লক্ষ্য বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দীর্ঘদিনের স্বায়ত্তশাসন ও একাডেমিক স্বাধীনতার ঐতিহ্যও সমানভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
এর জবাবে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, গবেষণা বাজেট বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে সব ধরনের জটিলতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সভায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের গবেষণা বাজেটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে অধ্যাপক মামুন আহমেদ জানান, নতুন অর্থবছরে গবেষণা খাতে মোট ২২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই অর্থ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপখাতে ব্যয় করা হবে। অর্থবছরের শুরুতেই স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল ও পিএইচডি পর্যায়ের গবেষণার জন্য প্রস্তাব আহ্বান করা হবে।
তিনি বলেন, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিজস্ব একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় গবেষণা প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে ইউজিসিতে পাঠাবে। এরপর জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকার, গবেষণার গুণগত মান, উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
গবেষণা কার্যক্রমে যেন কোনো ধরনের বিলম্ব না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই গবেষণা বাজেট বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা-সংক্রান্ত চাহিদা দ্রুত সংগ্রহ করা হবে এবং প্রস্তাব পাওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যেই প্রয়োজনীয় অর্থছাড়ের ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ইউজিসির মাধ্যমে গবেষণা বাজেট বাস্তবায়ন হলেও কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ কমানো হবে না। বরং আগের বছরের তুলনায় অধিক অর্থ পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে রাজধানীকেন্দ্রিক বা বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাশাপাশি দেশের আঞ্চলিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও গবেষণা অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পাবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য রাখা হবে না।
দেশে গবেষণার মানোন্নয়ন এবং গবেষণা কার্যক্রমকে আরও সমন্বিত ও ফলপ্রসূ করতে জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত গবেষণা ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান ইউজিসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে একটি জাতীয় গবেষণা রিপোজিটরি প্রতিষ্ঠা করা হবে। এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত গবেষণার তথ্য সংরক্ষণ, বিনিময় ও সমন্বয় সহজ হবে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের গবেষণার দৃশ্যমানতা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
সভায় দেশের ৪৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং তাঁদের মনোনীত প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এছাড়া ইউজিসির সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। সভায় গবেষণা বাজেট বাস্তবায়ন, অর্থ ব্যবস্থাপনা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অংশগ্রহণ এবং গবেষণার মানোন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।