
দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক, আঞ্চলিক কৌশলগত সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরতে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সেমিনার। আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি), জাপানের সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন (এসপিএফ) এবং রিক্কিও ইউনিভার্সিটির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সেমিনারে দেশি-বিদেশি গবেষক, শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারণী বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
বুধবার (৮ জুলাই) এআইইউবি অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত সেমিনারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি অনুধাবন’। আয়োজকদের মতে, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমসাময়িক ইস্যুতে প্রমাণভিত্তিক আলোচনা, একাডেমিক সংলাপ এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা জোরদার করার অভিন্ন অঙ্গীকার থেকেই এই আয়োজন করা হয়েছে।
সেমিনারের উদ্বোধনী পর্বে স্বাগত বক্তব্য দেন সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের সেন্টার ফর মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজ (সিএমএস)-এর ফেলো এবং জাপানের রিক্কিও ইউনিভার্সিটির অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ড. নাওনোরি কুসাকাবে। তিনি বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে জ্ঞানভিত্তিক সহযোগিতা এবং একাডেমিক বিনিময় আরও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে ঘিরে আঞ্চলিক কৌশল, নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনৈতিক বিষয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা ও নীতিগত আলোচনার পরিসর আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।
সেমিনারে সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিদের মধ্যে বক্তব্য দেন সেন্টার ফর মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজের পরিচালক ড. আকিকো হোরিবা, টোকিও ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজের ইনস্টিটিউট অব গ্লোবাল স্টাডিজের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও সিএমএস ফেলো ড. মাসাতো তোরিয়া এবং এসপিএফের প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট মিস কিয়োকা ওইমাতসু।
তাঁদের বক্তব্যে বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক সহযোগিতা, গবেষণা অংশীদারিত্ব, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং নীতিনির্ভর গবেষণাকে আরও শক্তিশালী করার আগ্রহের বিষয়টি উঠে আসে। বক্তারা বলেন, বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সমাপনী বক্তব্যে এআইইউবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম বলেন, সমসাময়িক আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আন্তবিষয়ক গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং গঠনমূলক নীতিনির্ধারণী সংলাপ এগিয়ে নিতে এআইইউবি ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র নয়, বরং নীতি প্রণয়ন, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ধরনের আন্তর্জাতিক সেমিনার শিক্ষার্থী ও গবেষকদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের পাশাপাশি বৈশ্বিক বাস্তবতা অনুধাবনে সহায়তা করবে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এআইইউবির রেজিস্ট্রার ড. মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিবেশকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হলে গবেষণাভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পৃক্ততা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
সেমিনারের একাডেমিক অধিবেশনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও শিক্ষাবিদরা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কৌশলগত বাস্তবতা নিয়ে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন।
এআইইউবির ফিন্যান্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ ‘দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং বাংলাদেশের ভূমিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এস এম আলী রেজা ‘বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক এবং দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতির ভবিষ্যৎ’ বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্ব, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্কের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করেন।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ল’র সহকারী অধ্যাপক মো. মোস্তফা হোসেন ‘আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথে: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ও জাপানের ভূমিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধে আন্তর্জাতিক আইন, বৈশ্বিক সুশাসন এবং বাংলাদেশ-জাপান সহযোগিতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কে এম মাহিউদ্দিন ‘দেশীয় রাজনীতি, সুশাসন এবং আঞ্চলিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান’ বিষয়ে বক্তব্য দেন। অন্যদিকে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক সালেহ মো. শাহরিয়ার ‘বাংলাদেশে চীনের সফট পাওয়ার কৌশল’ শীর্ষক প্রবন্ধে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব বিস্তারের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করেন।
এছাড়া বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) অধ্যাপক শাহাব এনাম খান ‘দক্ষিণ এশিয়ায় জাপানের সম্পৃক্ততা এবং বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান: দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের তাৎপর্য’ শীর্ষক গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। তিনি আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান এবং জাপানের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
সেমিনারে এআইইউবির সহ-উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুর রহমান, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, শিক্ষক, গবেষক এবং শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নীতিনির্ধারণী বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা অংশ নেন। বক্তারা দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় গবেষণা, জ্ঞান বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।