
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য অনুষ্ঠিত ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফল বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) প্রকাশের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা স্থগিত করা হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল প্রকাশের আগেই ঢাকা বিভাগের নয়টি জেলার ফলাফল নির্ধারিত ওয়েব লিংকে আপলোড হয়ে যাওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক বিভ্রান্তি। পরবর্তীতে ওই লিংক থেকে সাধারণ ব্যবহারকারীরা ফলাফল ডাউনলোড করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে বিষয়টি আলোচনায় আসে।
ঘটনার পর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) তাৎক্ষণিকভাবে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে ফলাফল নির্ধারিত সময়ের আগে ওয়েব পোর্টালে আপলোডের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের জারি করা পৃথক দুটি অফিস আদেশে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
অনুমতি ছাড়াই ফল আপলোডের অভিযোগ
অধিদপ্তরের এক আদেশে বলা হয়েছে, প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা-২০২৫-এর ফলাফল গত ৮ জুলাই প্রস্তুত করা হয়। এরপর ফলাফল প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ওয়েব লিংক তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয় অধিদপ্তরের সহকারী মেইনটেন্যান্স কর্মকর্তা মো. মেহতাব কায়েসকে।
আদেশ অনুযায়ী, তাঁকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ও ফল প্রকাশের আগে কোনোভাবেই ফলাফল ওয়েব পোর্টালে আপলোড করা যাবে না। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে ঢাকা বিভাগের নয়টি জেলার ফলাফল সংশ্লিষ্ট লিংকগুলোতে আপলোড করা হয়।
এর ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা ওই লিংক ব্যবহার করে ফলাফল দেখতে ও ডাউনলোড করতে সক্ষম হন। পরে সেই ফলাফল বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
নিরাপত্তা প্রটোকল মানা হয়নি
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আদেশে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, লাইভ সার্ভারে লিংক তৈরি এবং ফলাফল আপলোডের ক্ষেত্রে যে ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত প্রটোকল অনুসরণ করা প্রয়োজন ছিল, তা যথাযথভাবে মানা হয়নি।
অধিদপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের গাফিলতির কারণে আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের আগেই সংবেদনশীল তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, যা সরকারি ফল প্রকাশ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
মো. মেহতাব কায়েস নবম গ্রেডের কর্মকর্তা হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।
তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি
ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এবং দায় নির্ধারণে আলাদা এক অফিস আদেশে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন)-কে আহ্বায়ক করে গঠিত এ কমিটিকে অনুমতি ছাড়া ফলাফল প্রকাশের পুরো ঘটনা তদন্ত করে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
তদন্তে কীভাবে ফলাফল নির্ধারিত সময়ের আগে ওয়েব পোর্টালে প্রকাশ পেল, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোথায় ত্রুটি ছিল এবং কারও অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে বলে জানা গেছে।
ফল প্রকাশ পিছিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত
এর আগে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছিলেন, ফল প্রকাশের আগে একটি ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ ঘটনা ঘটেছে। সে কারণে নির্ধারিত দিনে ফল প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
তিনি জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হতে পারে।
এ বছর বৃত্তি পাবে ৮২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর মোট ৮২ হাজার ৫০০ জন শিক্ষার্থী প্রাথমিক বৃত্তি পাবে।
এর মধ্যে মোট বৃত্তির ৮০ শতাংশ বরাদ্দ থাকবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য। বাকি ২০ শতাংশ পাবে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীরা।
বৃত্তিপ্রাপ্তদের দুটি শ্রেণিতে আর্থিক সুবিধা দেওয়া হবে। এগুলো হলো—
ট্যালেন্টপুল বৃত্তি
সাধারণ গ্রেড বৃত্তি
মেধা ও নির্ধারিত নীতিমালার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের এই দুই ক্যাটাগরিতে বৃত্তি প্রদান করা হবে।
৬ লাখ ৪০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ
এ বছর প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৬ লাখ ৪০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী।
এর মধ্যে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার শিক্ষার্থী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এবং প্রায় ৯০ হাজার শিক্ষার্থী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেনের।
দেশের অধিকাংশ জেলায় গত ১৫ থেকে ১৮ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তবে বিশেষ ভৌগোলিক পরিস্থিতির কারণে পার্বত্য তিন জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ১৭ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত পৃথক সময়সূচিতে পরীক্ষা নেওয়া হয়।
ফলাফল প্রকাশের আগে তথ্য ফাঁসের এ ঘটনা প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের তথ্য-নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা আরও জোরদারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।