
ফেনীতে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলীয় ‘জুলাই পদযাত্রা’ উদ্বোধন; সরকার ও বিএনপির সমালোচনা, গণভোট বাস্তবায়নের দাবি
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, এনসিপির লক্ষ্য প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার অংশ হওয়া নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনা। তিনি বলেন, তরুণদের নেতৃত্বে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ব্যক্তি–কেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে জবাবদিহি, ন্যায়বিচার ও জনস্বার্থভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।
বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) সন্ধ্যায় ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার জিরো পয়েন্ট পৌরসভা প্রাঙ্গণে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলীয় ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির উদ্বোধনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘খেলার নিয়ম বদলাতে এসেছি’
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, দেশের রাজনীতিতে শুধু নতুন মুখ আসলেই পরিবর্তন আসে না; প্রয়োজন রাজনীতির ধারা ও সংস্কৃতির পরিবর্তন।
তিনি বলেন,
“আমরা পুরোনো খেলায় নতুন খেলোয়াড় হতে আসিনি, আমরা বরং খেলা পরিবর্তন করতে এসেছি। আমরা এ রাজনীতিতে রাজনীতিবিদদের জন্য প্রাচীর বানাতে এসেছি।”
তিনি তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের দায়িত্ব শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর নয়, বরং সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের।
তার ভাষায়, তরুণদের ঘরে ঘরে যেতে হবে, মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হবে, মায়েদের, ভাইদের ও সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি নতুন সমাজ গড়ে তুলতে হবে।
বিএনপির সমালোচনা
বক্তব্যে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেরও সমালোচনা করেন হাসনাত আবদুল্লাহ।
তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেকেই নিজেদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন নিয়ে কথা বলছেন। তবে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু ব্যক্তি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক হয়েছেন।
তার ভাষায়,
“অনেকে বলেন, আগে আমরা রিকশায় চলতাম, এখন গাড়িতে চলি। কিন্তু যারা এ কথা বলেন, তারা ভুলে যান—তারা আগে রিকশা চালাতেন, এখন প্রাডো গাড়ি চালান। কয়েক মাসের মধ্যে কীভাবে এই সম্পদের মালিক হলেন—সেটারও জবাব দিতে হবে।”
তিনি অভিযোগ করেন, মামলা–বাণিজ্য, সমাজে বিভাজন সৃষ্টি এবং বালু ব্যবসাসহ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে কিছু মানুষ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য শুধু চাঁদাবাজির ধরন পরিবর্তন নয়, বরং চাঁদাবাজদেরও পরিবর্তন করা। একইভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু দুর্নীতির পদ্ধতি নয়, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া।
কর্মসংস্থান ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন
সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ তুলে এনসিপির এই নেতা বলেন, ক্ষমতায় এসে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি।
তিনি অভিযোগ করেন, দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ এখনো বেকার এবং চাকরির আশায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) নিয়ে ঘুরছেন।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়েও তিনি সরকারের সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন,
“বিদ্যুতের পরিবর্তে মানুষ এখন মোমবাতি আর হারিকেন ধরছে। আগে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ যেত, এখন মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ আসে।”
এ ছাড়া তিনি দাবি করেন, দেশে এখনো মাদক, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি হয়নি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসেনি।
পাঁচ দাবিতে দক্ষিণাঞ্চলে পদযাত্রা
গণভোটের ফল বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারসহ কয়েকটি দাবিকে সামনে রেখে এনসিপি দক্ষিণাঞ্চলে তাদের ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা করে।
পদযাত্রাটি সোনাগাজী বাজারের তাকিয়া রোড থেকে শুরু হয়ে পৌরসভা প্রাঙ্গণে এসে পথসভায় পরিণত হয়।
অন্য নেতাদের বক্তব্য
পথসভায় সভাপতিত্ব করেন এনসিপির সোনাগাজী উপজেলা আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মামুন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান মোহাম্মদ জোনায়েদ, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব আকরাম হোসেন পিয়াল, যুগ্ম আহ্বায়ক নিজাম উদ্দিন, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম সুজা উদ্দিন, জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সভাপতি তরিকুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার, এনসিপি ফেনী জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সুজা উদ্দিন সজিব এবং সদস্য আবদুল্লাহ আল জোবায়েরসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।
কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান মোহাম্মদ জোনায়েদ বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেও গণভোটে দেওয়া জনগণের রায় বাস্তবায়ন করেনি।
তার দাবি, গণভোটের ফল বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত জুলাই আন্দোলনের কর্মীরা ঘরে ফিরবেন না। তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে এনসিপি পাঁচটি সুনির্দিষ্ট দাবি নিয়ে দেশব্যাপী পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করছে।
শহীদদের কবর জিয়ারত
সমাবেশের আগে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
হাসনাত আবদুল্লাহসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা ফেনীর সোনাগাজীতে শহীদ বোরহান উদ্দিনের কবর এবং ফুলগাজী উপজেলার আনন্দপুরে শহীদ সারোয়ার জাহান শ্রাবণের কবর জিয়ারত করেন।
পরে তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। এরপর সেখান থেকেই দক্ষিণাঞ্চলে এনসিপির মাসব্যাপী ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।