
উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও রাষ্ট্রগঠনের এক অনন্য অধ্যায়; একই সঙ্গে কর্তৃত্ববাদ, রাজনৈতিক বিতর্ক ও উত্তরাধিকার নিয়ে অব্যাহত আলোচনা
মালয়েশিয়ার ইতিহাসে এমন রাজনৈতিক নেতার সংখ্যা খুব বেশি নেই, যিনি একদিকে দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের স্থপতি হিসেবে প্রশংসিত, অন্যদিকে ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের কেন্দ্রেও রয়েছেন। ড. মাহাথির মোহাম্মদ সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন।
গত বছর শতবর্ষ অতিক্রম করার পর এবার তিনি পা রাখলেন জীবনের ১০১তম বছরে। ১৯২৫ সালের ১০ জুলাই জন্ম নেওয়া মাহাথির শুধু মালয়েশিয়ার দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রীই নন, বরং আধুনিক মালয়েশিয়া গঠনের অন্যতম প্রধান রূপকার হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে তিনি হয়ে ওঠেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক।
তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন উন্নয়ন, শিল্পায়ন, আধুনিকায়ন ও রাষ্ট্রীয় রূপান্তরের গল্প যেমন বহন করে, তেমনি বহন করে কর্তৃত্ববাদ, রাজনৈতিক সংঘাত, বিচার বিভাগ নিয়ে বিতর্ক এবং বিরোধী মত দমনের অভিযোগও।
চিকিৎসক থেকে রাষ্ট্রনায়ক
মাহাথির বিন মোহাম্মদের জন্ম মালয়েশিয়ার কেদাহ রাজ্যের আলোর সেটারে একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে। বাবা ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। পরিবারের ১০ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও পরিশ্রমী। চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে ১৯৫৩ সালে সরকারি চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। প্রায় চার বছর সরকারি চাকরি করার পর নিজ শহরে একটি ব্যক্তিগত ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেন। চিকিৎসক হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পাশাপাশি তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘ডা. এম’ নামে।
পরবর্তী সময়ে মাহাথির একাধিকবার বলেছেন, চিকিৎসা পেশায় মানুষের বাস্তব সমস্যা খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতাই তাঁকে রাজনীতিতে আসতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাঁর বিশ্বাস ছিল, চিকিৎসকদের মতো বাস্তববাদী চিন্তাভাবনা রাষ্ট্র পরিচালনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রাজনৈতিক যাত্রার শুরু
মাত্র ২১ বছর বয়সে, ১৯৪৬ সালে, ইউনাইটেড মালয়াস ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (ইউএমএনও)-তে যোগ দিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন মাহাথির।
১৯৬৪ সালে প্রথমবারের মতো পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন। তবে মালয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থে কঠোর অবস্থান নেওয়াকে কেন্দ্র করে ১৯৬৯ সালে দল থেকে বহিষ্কৃত হন এবং সংসদীয় আসনও হারান।
রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের এই ধাক্কা তাঁর পথচলা থামাতে পারেনি। ১৯৭২ সালে তিনি আবার ইউএমএনওতে ফিরে আসেন। এরপর দ্রুত দলের নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে উঠে আসেন।
১৯৭৩ সালে সুপ্রিম কাউন্সিলের সদস্য এবং সিনেটর হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একই সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
দীর্ঘ ২২ বছরের শাসন
১৯৭৬ সালে উপপ্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মাহাথিরের রাজনৈতিক উত্থান আরও গতি পায়।
১৯৮১ সালে ইউএমএনওর সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি মালয়েশিয়ার চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর টানা ২২ বছর—২০০৩ সাল পর্যন্ত—তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা আজও মালয়েশিয়ার ইতিহাসে দীর্ঘতম।
পরে ২০১৮ সালে আবারও নির্বাচনে জয়ী হয়ে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন। ২০২০ সাল পর্যন্ত সেই দায়িত্ব পালন করেন। সব মিলিয়ে তিনি প্রায় ২৪ বছর মালয়েশিয়ার সরকারপ্রধান ছিলেন।
কৃষিনির্ভর দেশ থেকে শিল্পোন্নত অর্থনীতির পথে
মাহাথিরের সবচেয়ে বড় অবদান হিসেবে ধরা হয় মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক রূপান্তর।
ক্ষমতায় এসে তিনি কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে শিল্প, প্রযুক্তি ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিতে রূপান্তর করেন।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, ভারী শিল্প গড়ে তোলা, ইলেকট্রনিকস খাতের সম্প্রসারণ এবং দেশীয় অটোমোবাইল শিল্পের বিকাশে তিনি বড় ধরনের উদ্যোগ নেন।
তাঁর সময়েই মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়।
উন্নয়নের প্রতীক হয়ে ওঠা মেগা প্রকল্প
মাহাথির আমলে বাস্তবায়িত একাধিক অবকাঠামো প্রকল্প আজও মালয়েশিয়ার উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার
কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (KLIA)
পুত্রাজায়া প্রশাসনিক রাজধানী
নর্থ-সাউথ এক্সপ্রেসওয়ে
এসব প্রকল্প শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নই নয়, বরং মালয়েশিয়াকে একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
‘ভিশন ২০২০’—একটি জাতীয় রূপান্তরের পরিকল্পনা
১৯৯১ সালে মাহাথির ঘোষণা করেন তাঁর বহুল আলোচিত ‘ভিশন ২০২০’।
এই দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল মালয়েশিয়াকে একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা।
এই পরিকল্পনার আওতায় শিক্ষা, প্রযুক্তি, শিল্প, বিজ্ঞান, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ভিশনই মালয়েশিয়ার আধুনিক রাষ্ট্রগঠনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
সামাজিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন
মাহাথিরের দীর্ঘ শাসনামলে শুধু অর্থনীতিই নয়, সামাজিক সূচকেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে।
তাঁর সময়ে—
মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তার ঘটে
দারিদ্র্যের হার কমে
শিক্ষার সুযোগ বাড়ে
কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়
মাথাপিছু আয় বাড়ে
গড় আয়ু বৃদ্ধি পায়
বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় মালয়েশিয়ায় জাতিগত সম্প্রীতি বজায় রাখার বিষয়েও তিনি নানা নীতি গ্রহণ করেন।
উন্নয়নের পাশাপাশি বিতর্ক
যদিও মাহাথিরকে উন্নয়নের রূপকার বলা হয়, তাঁর শাসনামল ছিল নানা বিতর্কে ঘেরা।
বিশেষ করে ১৯৮৭ সালের অপারেশন লালাং, ১৯৮৮ সালের বিচার বিভাগীয় সংকট, গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং বিরোধী মত দমনের অভিযোগ তাঁকে দীর্ঘদিন সমালোচনার মুখে রেখেছে।
সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, ক্ষমতা ধরে রাখতে তিনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছেন।
তবে মাহাথির বরাবরই এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে সম্পর্ক
মাহাথিরের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে ঘিরে।
একসময় মাহাথিরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত আনোয়ার ১৯৯৩ সালে উপপ্রধানমন্ত্রী হন।
কিন্তু ১৯৯৮ সালে দুজনের মধ্যে গুরুতর রাজনৈতিক মতবিরোধ সৃষ্টি হয়।
এরপর আনোয়ারকে উপপ্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয় এবং পরে দুর্নীতি ও সমকামিতার অভিযোগে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আনোয়ার শুরু থেকেই এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন।
অবসর, আবার প্রত্যাবর্তন
২০০৩ সালে মাহাথির স্বেচ্ছায় প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি রাজনীতি থেকে পুরোপুরি দূরে থাকেননি। বিভিন্ন সময়ে সরকারের সমালোচনা করেন এবং জাতীয় বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দিয়ে আলোচনায় থাকেন।
২০১৮ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে তিনি আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন।
৯২ বছর বয়সে তিনি বিরোধী জোট পাকাতান হারাপান-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
সেই নির্বাচনে জয়ী হয়ে ৯৪ বছর বয়সে বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবারও শপথ নেন।
দ্বিতীয় দফা ক্ষমতা ও আকস্মিক পদত্যাগ
নির্বাচনী সমঝোতা অনুযায়ী দুই বছর পর আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা থাকলেও নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাহাথির আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করেন।
এর ফলে তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার ভেঙে পড়ে এবং মালয়েশিয়ায় নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়।
রাজনৈতিক জীবনের বড় ধাক্কা
২০২২ সালের সাধারণ নির্বাচনে মাহাথির নিজের সংসদীয় আসন হারান।
১৯৬৯ সালের পর এই প্রথম তিনি কোনো নির্বাচনে পরাজিত হন।
মাত্র ৭ শতাংশ ভোট পাওয়া তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হয়।
শতবর্ষ পেরিয়েও সক্রিয়
বয়সের ভার ও একাধিক স্বাস্থ্যগত জটিলতা সত্ত্বেও মাহাথির এখনো জনপরিসরে সক্রিয়।
হার্টের বাইপাস সার্জারি, করোনা সংক্রমণ এবং চলতি বছরের শুরুতে পড়ে গিয়ে নিতম্বে গুরুতর আঘাত পাওয়ার পরও তিনি রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে নিয়মিত মতামত দিয়ে যাচ্ছেন।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন,
“কাজই হলো সবচেয়ে ভালো ওষুধ।”
তিনি আরও বলেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যতটা সম্ভব মালয়েশিয়ার উন্নয়নে অবদান রাখতে চান।
ইতিহাসে মাহাথিরের অবস্থান
মাহাথির মোহাম্মদের উত্তরাধিকারকে এককভাবে মূল্যায়ন করা সহজ নয়।
সমর্থকদের কাছে তিনি আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি—যিনি একটি কৃষিনির্ভর দেশকে শিল্পোন্নত ও মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে রূপান্তর করেছেন।
অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, তাঁর উন্নয়ন মডেলের পাশাপাশি ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের বিষয়গুলোও ইতিহাসের আলোচনায় সমান গুরুত্ব পাবে।
তবে একটি বিষয়ে প্রায় সব পক্ষই একমত—মালয়েশিয়ার আধুনিক রাষ্ট্রগঠন, অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হলে মাহাথির মোহাম্মদের নাম অনিবার্যভাবেই উচ্চারিত হবে। চিকিৎসক থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠা এই নেতার কর্মজীবন আগামী প্রজন্মের জন্য গবেষণা, বিতর্ক ও রাজনৈতিক অধ্যয়নের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।