
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতে একদিকে ইরান নিজের সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরোধ ক্ষমতার বার্তা দিতে চাইছে, অন্যদিকে বিশ্বের প্রধান সামরিক পরাশক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান ও প্রতিরোধক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরব পারসপেক্টিভস ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জেইদন আলকিনানি আল–জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ মূল্যায়ন করেছেন।
‘অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি’
জেইদন আলকিনানি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং সামরিক সংঘাতের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়া কঠিন।
তাঁর ভাষায়, সামরিক হামলা শুরু হলে শান্তি চুক্তি বা কূটনৈতিক রূপরেখা কার্যকর রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক মাস ধরে অঞ্চলটিতে তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছিল। তবে সাম্প্রতিক হামলাগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বৃহত্তর কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এগুলো পরিচালিত হচ্ছে।
‘দর-কষাকষির অবস্থান শক্ত করতেই সামরিক চাপ’
আলকিনানির মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের লক্ষ্য কেবল যুদ্ধ নয়, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দর-কষাকষিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করাও।
তিনি বলেন, বিভিন্ন পক্ষ প্রায়ই সামরিক চাপ সৃষ্টি করে আলোচনার টেবিলে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করে। বর্তমান পরিস্থিতিও সেই কৌশলের অংশ হতে পারে।
মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা, পাল্টা শক্তি প্রদর্শন
বিশ্লেষক বলেন, ইরান ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রতিরোধ সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব তুলে ধরতে চাইছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রধান সামরিক শক্তি হিসেবে তার বৈশ্বিক অবস্থান ও বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ন রাখতে দৃঢ় অবস্থান প্রদর্শন করছে।
আলকিনানির মতে, এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানই বর্তমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে।
আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর চেষ্টা করছে ইরান
জেইদন আলকিনানি মনে করেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ইরান নিজেকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও আক্রমণাত্মক রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ইরান তার সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কাছে নতুন বার্তা দিতে চাইছে।
একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আশঙ্কা, ভুল–বোঝাবুঝি এবং কৌশলগত হিসাব-নিকাশও বর্তমান উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে বলে তাঁর অভিমত।
কূটনৈতিক সমাধান চায় উপসাগরীয় দেশগুলো
বিশ্লেষকের মতে, চলমান সংকট নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং তারা কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে।
তিনি বলেন, এসব দেশের প্রধান লক্ষ্য হলো যত দ্রুত সম্ভব যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটানো এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
নতুন আঞ্চলিক জোটের সম্ভাবনা
আলকিনানি মনে করেন, বর্তমান সংকট দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণেও পরিবর্তন আনতে পারে।
তাঁর মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক কীভাবে পুনর্গঠন করবে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে।
এ ছাড়া আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন কোনো বহুজাতিক বা আঞ্চলিক জোট গঠনের বিষয়েও দেশগুলো আলোচনা করতে পারে বলে তিনি ধারণা প্রকাশ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর চিন্তা
বিশ্লেষকের মতে, ভবিষ্যতের কৌশল নির্ধারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকবে।
এর মধ্যে রয়েছে—
ইরান ও ইসরায়েলের আঞ্চলিক প্রভাব ও সম্প্রসারণবাদ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়;
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কীভাবে কমানো যায়;
এবং নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো আরও শক্তিশালী করার বিকল্প উপায় কী হতে পারে।
স্থিতিশীলতাই প্রধান লক্ষ্য
তবে সবকিছুর পরও আলকিনানি মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ দেশই নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত চায় না।
তাঁর মতে, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর প্রধান লক্ষ্য হবে সংঘাতের দ্রুত অবসান ঘটিয়ে পরিস্থিতিকে আগের মতো স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বর্তমান সামরিক উত্তেজনা শুধু দুই দেশের সম্পর্কের বিষয় নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, আঞ্চলিক জোট, জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক কূটনীতির ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। আগামী দিনগুলোতে কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে এই সংকট নতুন যুদ্ধের দিকে গড়াবে নাকি আলোচনার পথেই সমাধানের চেষ্টা এগোবে।