
পূর্ব চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশে শক্তিশালী টাইফুন ‘বাভি’ আঘাত হেনেছে। ঝড়ের প্রভাবে ব্যাপক বৃষ্টি, দমকা হাওয়া ও জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কায় দেশটির পূর্বাঞ্চলে সর্বোচ্চ সতর্কতাগুলোর একটি জারি করা হয়েছে এবং নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে ১৭ লাখেরও বেশি মানুষ। একই সময়ে টাইফুন–সংশ্লিষ্ট প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ফিলিপাইনে ভূমিধসে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং তাইওয়ানে আহত হয়েছেন অন্তত ১৩৪ জন।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার খবরে বলা হয়েছে, প্রাদেশিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শনিবার স্থানীয় সময় রাত ১১টা ২০ মিনিটে টাইফুন ‘বাভি’ ঝেজিয়াং প্রদেশের উপকূলে আঘাত হানে।
আবহাওয়াবিদদের ধারণা, স্থলভাগে প্রবেশের পর ঝড়টি ধীরে ধীরে উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং ক্রমান্বয়ে শক্তি হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়বে।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে চীনে দ্বিতীয় টাইফুন
মাত্র এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময়ের ব্যবধানে এটি চীনে আঘাত হানা দ্বিতীয় শক্তিশালী টাইফুন।
এর আগে গত সপ্তাহান্তে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে টাইফুন ‘মায়সাক’ আঘাত হানে। পরপর দুটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের মুখে পড়ায় চীনের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে দুর্যোগ মোকাবিলায় অতিরিক্ত সতর্কতা জোরদার করেছে কর্তৃপক্ষ।
চীনের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা টাইফুন বাভির কারণে ‘কমলা সতর্কতা’ জারি করেছে। দেশটির চার স্তরের সতর্কতা ব্যবস্থায় এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সতর্কসংকেত।
১৭ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া
টাইফুনের প্রভাবে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ঝেজিয়াংসহ পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৭ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঝড়টি স্থলভাগে আঘাত হানার সময় এর কেন্দ্রের কাছাকাছি বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১৪৪ কিলোমিটার (প্রায় ৮৯ মাইল)।
ভারী বৃষ্টি, দমকা হাওয়া এবং উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বিবেচনায় স্থানীয় প্রশাসন জরুরি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
পরিবহন ও শিক্ষা কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব
টাইফুনের কারণে চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে শত শত উড়োজাহাজের ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। ট্রেন চলাচল সীমিত করা হয়েছে এবং বহু ফেরি সার্ভিস সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্কুল, কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থানের আহ্বান জানিয়েছে।
বাসিন্দাদের প্রস্তুতি
ঝেজিয়াং প্রদেশের ঘনবসতিপূর্ণ শহর ওয়েনঝুর বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী হুয়াং জিংহুয়ান ঝড়ের আগেই পরিবারের জন্য কয়েক দিনের প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পানীয় মজুত করেছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেন, কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও আগে একাধিক টাইফুন মোকাবিলার অভিজ্ঞতা তাঁদের রয়েছে।
হুয়াং বলেন, ‘আমি একটু চিন্তিত। তবে আমার মনে হয়, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমরা আগেও টাইফুন মোকাবিলা করেছি। এবারও সামলে উঠতে পারব।’
ফিলিপাইনে ভূমিধসে নিহত ১৭
এদিকে টাইফুন বাভির প্রভাবে শক্তিশালী দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হয়ে ওঠায় ফিলিপাইনের বিভিন্ন এলাকায় টানা ভারী বৃষ্টি হচ্ছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রবল বর্ষণের কারণে বিভিন্ন স্থানে ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
উদ্ধারকারী দল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তাইওয়ানে আহত অন্তত ১৩৪
চীনে আঘাত হানার আগে টাইফুন ‘বাভি’ জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপপুঞ্জ ও তাইওয়ানের ওপর দিয়ে বয়ে যায়।
তাইওয়ানের আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রবল বাতাস ও ভারী বৃষ্টির কারণে অন্তত ১৩৪ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই পিচ্ছিল সড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।
শনিবার সকাল পর্যন্ত তাইওয়ানের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে তাইচুং শহর ও হুয়ালিয়েন কাউন্টি থেকে প্রায় ১৪ হাজার ২১০ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তাইওয়ানজুড়ে স্কুল, সরকারি-বেসরকারি অফিস এবং অধিকাংশ রেস্তোরাঁ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে জরুরি সেবা ছাড়া অন্যান্য কার্যক্রম সীমিত রাখা হয়েছে।
জলবায়ু ঝুঁকি নিয়ে নতুন উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে শক্তিশালী টাইফুনের সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় চীন, তাইওয়ান, জাপান ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোতে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
পরপর শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় অবকাঠামো, কৃষি, পরিবহন ও জনজীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।