
দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার অবসান ঘটিয়ে বান্দরবানের দুর্গম থানচি উপজেলার তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়কে সরকারি ঘোষণা করেছে সরকার। এখন থেকে বিদ্যালয়টির নতুন নাম হবে ‘তিন্দু সরকারি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়’। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সোমবার (১৪ জুলাই) এ–সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ১৩ জুলাই ২০২৬ থেকে বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় সরকারি বিদ্যালয় হিসেবে গণ্য হবে। একই সঙ্গে প্রচলিত সরকারি বিধি-বিধান অনুযায়ী বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীদের আত্তীকরণ (অ্যাবসর্পশন) করা হবে। তবে আত্তীকৃত শিক্ষক ও কর্মচারীদের চাকরি বদলিযোগ্য হবে না, অর্থাৎ তাঁরা ওই বিদ্যালয়েই দায়িত্ব পালন করবেন।
সংসদে ঘোষণার পর জারি হলো প্রজ্ঞাপন
এর আগে জাতীয় সংসদে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের ঘোষণা দেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি জানান, বিদ্যালয়টি সরকারি করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পাওয়া গেছে এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
সংসদে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে থানচির তিন্দু এলাকার বিদ্যালয়টিকে সরকারি করার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই নির্দেশনার ভিত্তিতেই জাতীয়করণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
সংগ্রামী প্রধান শিক্ষকের গল্পে সাড়া পড়ে দেশজুড়ে
সম্প্রতি বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেনের ব্যতিক্রমী সংগ্রামের গল্প জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত বিদ্যালয়টি ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে সেখানে ৫৬ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পরিবার অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় নিয়মিত বেতন পরিশোধ সম্ভব হতো না। ফলে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ে।
ছুটির দিনে নৌকা চালিয়ে বিদ্যালয় চালানোর ব্যতিক্রমী উদ্যোগ
বিদ্যালয়টি সচল রাখতে প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে এক অনন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ছুটির দিনগুলোতে তিনি থানচি–তিন্দু–রেমাক্রী নৌপথে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে পর্যটক ও স্থানীয় যাত্রী পরিবহন করতেন।
নৌকা চালিয়ে যে অর্থ আয় হতো, তার বড় একটি অংশ তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে ব্যয় করতেন।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিল—এই দুই মাসেই নৌকা চালিয়ে তিনি প্রায় ৪০ হাজার টাকা আয় করেন। এর মধ্যে ৩০ হাজার টাকা তিনি সহকর্মীদের বেতন পরিশোধে ব্যয় করেন, যাতে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ না হয়ে যায়।
দেশজুড়ে প্রশংসা, পরে সরকারের উদ্যোগ
দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে প্রধান শিক্ষকের এই আত্মত্যাগ ও দায়িত্ববোধ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। তাঁর এই উদ্যোগ শিক্ষা ও জনসেবার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচিত হয়।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় প্রশাসন বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়। এর মধ্যে বিদ্যালয়ের জন্য একটি ইঞ্জিনচালিত বোটের ব্যবস্থা, নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণ এবং ছাত্রাবাস সংস্কারের উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য।
পরবর্তীতে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এলে তিনি বিদ্যালয়টি সরকারি করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে শিক্ষামন্ত্রীকে নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিদ্যালয়টিকে সরকারি ঘোষণার প্রজ্ঞাপন জারি করল।
শিক্ষার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হওয়ার আশা
স্থানীয়দের মতে, সরকারি স্বীকৃতি পাওয়ায় দুর্গম তিন্দু এলাকার শিক্ষার্থীরা এখন আরও উন্নত শিক্ষাসুবিধা পাবে। পাশাপাশি শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি পাবে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, একজন প্রধান শিক্ষকের অসাধারণ আত্মত্যাগ ও দায়িত্ববোধের স্বীকৃতি হিসেবে এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎই বদলে দেবে না, বরং দুর্গম অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে সরকারের অঙ্গীকারকেও আরও শক্তিশালী করবে।